Page Nav

HIDE

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Grid

GRID_STYLE

শিরোনাম

latest

জিহাদের অর্থ বিকৃতি

মাদারে ইলমী দারুল উলূম দেওবন্দের শায়খুল হাদীস, উস্তাদে মুহতারাম মুফতী সাঈদ আহমদ পালনপুরী দা.বা.-কে কিছুদিন আগে প্রশ্ন করা হয়েছিল, হযরত! রাজন...

মাদারে ইলমী দারুল উলূম দেওবন্দের শায়খুল হাদীস, উস্তাদে মুহতারাম মুফতী সাঈদ আহমদ পালনপুরী দা.বা.-কে কিছুদিন আগে প্রশ্ন করা হয়েছিল, হযরত! রাজনীতি কী জিহাদের অন্তর্ভুক্ত?
প্রশ্নটি শোনে শায়েখ খানিকটা রেগে গিয়ে বললেন, ‘ঘোড়ার পেটে কি গাধা জন্ম নিতে পারে, কিংবা গাধার পেটে ঘোড়া হতে পারে? কেমন আহম্মকের আহম্মক! এমন ছাত্রও দারুল উলূমে পড়তে আসে’!
শায়েখ আজ থেকে ৯ বছর পূর্বেই ‘জামে তিরমিযী’র ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘তুহফাতুল আলমায়ী’র জিহাদ অধ্যায়ে লিখে রেখেছেন যে, ‘জিহাদ একটি ইসলামী পরিভাষা। দ্বীনের সংরক্ষণ ও মর্যাদা বুলন্দীর জন্য ইসলামের দুশমনদের সাথে লড়াই করাকে জিহাদ বলে। কুরআন-হাদীসের যেখানেই শব্দটি এসেছে, সেখানে শুধু ‘কিতাল ফী সাবিলীল্লাহ’ তথা আল্লাহর রাস্তায় সশস্ত্র সংগ্রামকেই উদ্দেশ্য করা হয়েছে। তাই ইসলামী এই পরিভাষাকে দ্বীনের অন্য কোনো কাজের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা ঠিক নয়’।
(খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৫৫১/৫৫২)।
আমাদের ‘বুখারী শরীফ’র ক্লাসে তিনি খুব জোরালোভাবে বলতেন, ‘আমি নিশ্চিত হয়েই বলছি, যারা জিহাদ সম্পর্কিত আয়াত/হাদীসকে অন্য কোথাও নিয়ে ফিট করে, তারা নিঃসন্দেহে কুরআন-সুন্নাহর বিকৃতি করছে’।
দারুল উলূমের ‘ফতোয়া বিভাগ’ থেকেও এমন ফতোয়াই দেয়া হয়েছে যে, ‘কুরআন-হাদীসে বিভিন্ন বিষয়ের ফযীলত এসেছে। এগুলোর মূল ভিত্তি হলো শরঈ পরিভাষার ওপর। (আর জিহাদও একটি শরঈ পরিভাষা)। তাই কুরআন-হাদীসে জিহাদ তথা আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করার ব্যাপারে যে সমস্ত ফযীলত বর্ণিত হয়েছে সেগুলোকে দ্বীনের অন্যান্য খেদমত ও চেষ্টা-মেহনতের ওপর ফিট করা জায়েয নয়’।
(ফতোয়াটির লিঙ্ক: http://www.darulifta-deoband.com/…/Dawah–Tableeg/151724)।
.
কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশে দেওবন্দী ঘরানার কিছু মানুষই বর্তমানে গণতান্ত্রিক নির্বাচনকে জিহাদ বলে ঘোষণা দেয়! এসব দেখে সত্যিই আশ্চর্য লাগে। মাওলানা সাদ সাহেবও দাওয়াত ও তাবলীগকে জিহাদ মনে করতেন। জিহাদ সম্পর্কিত শরীয়তের ভাষ্যকে তাবলীগে নিয়ে ফিট করতেন। দারুল উলূম থেকে তার বিরুদ্ধে ফতোয়া দেয়ার এটিও একটি কারণ। যারা নির্বাচনকে জিহাদ ঘোষণা দিয়েছে, তারাও কিন্তু দারুল উলূমের ফতোয়াকে সামনে রেখে মাওলানা সাদ সাহেবের বিরোধিতা করেছিল। এখন তারাই আবার কিসের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক পদ্ধতির নির্বাচনকে জিহাদ বলে চালিয়ে দেয়—বুঝে আসে না। মাওলানা সাদ সাহেবও অপব্যাখ্যা করে বলেছিল, ‘দাওয়াত এবং জিহাদের উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন। তাই দাওয়াতকে জিহাদ বলা যাবে’। এখন নির্বাচন ও ভোটাভুটিকেও জিহাদের অংশ বানানোর জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপব্যাখ্যা দেয়া হয়! বাট, এসব অপব্যাখ্যা ওলামায়ে দেওবন্দ বহু আগেই উড়িয়ে দিয়েছেন।
দাওয়াত ও তাবলীগের মতো নিরেট দ্বীনী কাজ যদি জিহাদ না হতে পারে, তাহলে তো গণতান্ত্রিক নির্বাচন জিহাদ হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।
.
কিছু ভাই আমীরে শরীয়ত মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুরের ভাষণ ও মুফতী আমিনী রহিমাহুমাল্লাহ-এর একটি পোস্টার দ্বারা দলীল দিতে চায়। ভোট কারচুপি না হলে তৎকালে হাফেজ্জী হুজুর রহ. নিঃসেন্দেহ সরকার গঠন করতে পারতেন। তাই বর্তমানের দলগুলোকে হাফেজ্জী হুজুরের দলের সাথে তুলনা করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। তাছাড়া ‘নির্বাচনকে জিহাদ’ বলাটা হাফেজ্জী হুজুরের ব্যক্তিগত মতামতও ধরা যেতে পারে। হাফেজ্জী হুজুরের সন্তানরাও বর্তমানে রাজনীতির মাঠে আছেন। তাঁরা কিন্তু নির্বাচনকে জিহাদ বলে প্রচার করছেন না। কারও বিচ্ছিন্ন অভিমত কখনও শরীয়তের দলীল নয়। হাজ্বী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহ. মিলাদ-কিয়াম করেতেন। এর পক্ষে পুস্তিকাও রচনা করেছেন। মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গূহী রহ.-কে যখন তাঁর ছাত্ররা প্রশ্ন করতো, হযরত! আপনার পীর ও উস্তাদ হাজ্বী সাহেব তো কিয়াম করে থাকেন, এসম্পর্কে আপনি কি বলবেন?
তখন হযরত গাঙ্গূহী রহ. স্পষ্টভাষায় জবাব দিয়েছিলেন, ‘আমরা হাজ্বী সাহেবের কাছে তরীকতের ওপর বায়আত হয়েছি; শরীয়তের ওপর নয়। ব্যক্তিবিশেষের মতামত শরীয়তের দলীল হতে পারে না। শরীয়তের দলীল হলো কেবল কুরআন এবং সুন্নাহ’। তাই তো আকাবিরগণ মিলাদ-কিয়ামকে বিদআত বলে ফতোয়া দিয়েছেন। মূলত এটাই প্রকৃত ওলামায়ে দেওবন্দের আদর্শ।
.
মুফতী ফজলুল হক আমিনীও(রহ.) নির্বাচনকে জিহাদ মনে করতেন না। নির্বাচনী পোস্টারে জিহাদের কথাটি তাঁর অজান্তে হওয়ারও সম্ভাবনা আছে। কারণ, তাঁর জামাতা, বড় কাটারা মাদ্রাসার বর্তমান প্রিন্সিপাল মুফতী সাইফুল ইসলাম সাহেব একবার জানতে চেয়েছিলেন যে, হযরত! আপনারা কি হিসেবে গণতন্ত্রের রাজনীতি বেছে নিলেন?
তখন তিনি বলেছিলেন, ‘বর্তমানে গণতন্ত্র ছাড়া আমরা সবখানে অন্যায়ের প্রতিবাদ, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে পারবো না। তাই গণতন্ত্রের প্রতি ঘৃণা থাকা সত্ত্বেও নিরুপায় হয়ে এটাকে গ্রহণ করেছি’।
(মুফতী আমিনীর জীবন ও সংগ্রাম বইটি দ্রষ্টব্য)। এই কথার দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেল, তিনিও নির্বাচনকে জিহাদ মনে করতেন না। বাংলার এই সিংহপুরুষ তো সশস্ত্র সংগ্রামে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে অনেকেই আফগানিস্তানের জিহাদে শরীক হয়েছে। আফগান ফেরত মুজাহিদদের লিস্টে তাঁর এক জামাতার নামও আছে। তাঁর দল হয়তো এখন ছত্রভঙ্গ গেছে। হযরতের পরিপূর্ণ আদর্শের ওপর টিকে থাকতে পারেনি। তথাপি তারাও কিন্তু নির্বাচনকে জিহাদ বলে চালিয়ে দিচ্ছে না। আমরা প্রকৃত জিহাদ করতে পারি না—এটা তো আমাদেরই দুর্বলতা। এটুকু তো অন্তত স্বীকার করা চাই। তা না করে আমরা উল্টো কুরআন-সুন্নাহর বিকৃতি ঘটাই! সঠিকভাবে ইসলামী রাজনীতি করলে এটাকে বড়জোর ইবাদত বলা যেতে পারে। আকাবিরগণ তা ভেবেই রাজনীতিতে জড়াতেন। কিন্তু বর্তমানে যে নোংরা রাজনীতি শুরু হয়েছে: নিজেদের মধ্যে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি, অকথ্য ভাষায় গালাগালী, জোটের বাইরে যারা আছে তারা জোটবদ্ধদেরকে গোমরাহ মনে করে, আর জোটবদ্ধরা জোটহীনদেরকে দালাল ট্যাগ দেয়, এমন ঘৃণিত রাজনীতি আদৌ ইবাদত হবে কিনা—সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই দুঃখে এখনও কোনও রাজনৈতিক দলেই যোগ দেইনি।

কোন মন্তব্য নেই