Page Nav

HIDE

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Grid

GRID_STYLE

শিরোনাম

latest

বিজয়ের পদধ্বনি

বিজয়ের পদধ্বনি-১ || কাবুলের আকাশে-বাতাসে শোনা যায় তালিবানের পুনরুত্থান প্রতিধ্বনি মুল : ত্বাহা আলী আদনান আর মাত্র কয়েক মাস পরেই বৈশ্বিক ...

বিজয়ের পদধ্বনি-১ || কাবুলের আকাশে-বাতাসে শোনা যায় তালিবানের পুনরুত্থান প্রতিধ্বনি

মুল : ত্বাহা আলী আদনান আর মাত্র কয়েক মাস পরেই বৈশ্বিক জিহাদী তানজিম আল-কায়েদা কর্তৃক অ্যামেরিকায় পরিচালিত ৯/১১ হামলার ২০ বছর পূর্তি হতে চলেছে। একই সাথে আফগানিস্তানে ক্রুসেডার অ্যামেরিকার আক্রমণেরও ২০ বছর পূর্ণ হবে। দীর্ঘ এই লড়াইয়ে তালিবান আর আল-কায়েদা মুজাহিদদের কৌশলী হামলায় লাঞ্চনাকর পরাজয়ের শিকার ক্রুসেডার মার্কিন ও ন্যাটা জোট। ফলে বাধ্য হয়েই আফগানিস্তান ছাড়তে হচ্ছে কথিত এই পরাশক্তিকে। মার্কিন সৈন্যদের আফগান ছেড়ে যাওয়ায় আতংক আর ভয় গ্রাস করছে কাবুল প্রশাসনের অন্তরে। মুরতাদ বাহিনীর ওপর তালিবানের হামলা বেড়েছে আগের চেয়ে আরও কয়েকগুণ বেশী। একে একে কেন্দ্রীয় ও গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোও এখন দখলে নিয়ে যাচ্ছে তালিবান।

আফগানিস্তানে তালিবানদের সাম্প্রতিক বিজয় অভিযান নিয়ে কথা বলার আগে একবার পিছনে ফেরে তাকানোও উচিৎ বলে মনে করি।

আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের লক্ষ্য ও অর্জনঃ

বিশ বছর আগে ক্রুসেডার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে অবস্থিত আরব মুজাহিদ শাইখ ওসামা বিন লাদেন রহিমাহুল্লাহ-কে ৯/১১ হামলার জন্য দোষারোপ করেছিল এবং দাবি করেছিল যে আমিরুল-মু’মিনিন মোল্লা মুহাম্মদ উমার রহিমাহুল্লাহ এর নেতৃত্বাধীন ইসলামিক ইমারতের শাসন ব্যবস্থা শাইখ উসামা বিন লাদেন রহিমাহুল্লাহ’র এই কাজের সাথে জড়িত ছিল। অ্যামেরিকা তখন শাইখ উসামাকে তাদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি করেছিল। কিন্তু প্রতিবারই অ্যামেরিকানরা মোল্লা ওমর মুজাহিদের কাছ থেকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া নিয়েই ফিরে গেছে। কারণ মোল্লা ওমর কোন মুসলিম ভাইকে কাফেরের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য কোনক্রমেই প্রস্তুত ছিলেন না। বিপরীতে তিনি মার্কিন পক্ষকে তাদের দাবির পক্ষে মজবুত কোন প্রমাণ সরবরাহ এবং তা ইসলিমক ইমারতকে দেখানোর জন্য বলে আসছিলেন। কিন্তু শাইখ ওসামা ও তারা সাথীরা হামলাটি এতটাই নিপুণতার সাথে পরিচালনা করেছিলেন যে, ক্রুসেডার অ্যামেরিকা এটা প্রমাণ করতে ব্যার্থ হয়েছে যে, শাইখ ওসামা রহ. ও তাঁর সাথীরা এই বরকতময় হামলাটি চালিয়েছেন বা তিনি এর মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন। ফলে মোল্লা ওমর রহিমাহুল্লাহ তাঁর অবস্থানে দৃঢ় ছিলেন।

এর প্রেক্ষিতে অহংকারে অন্ধ অ্যামেরিকা স্বাধীন দেশ আফগানিস্তানে আক্রমন করে বসে। অ্যামেরিকা হয়তো নিজের অহংকারের কারণে তখন ভুলেই গিয়েছিল যে, এটা সাম্রাজ্যবাদীদদের কবরস্থান। এখন বিশ বছর পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই এই প্রশ্ন উঠেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্ররা মোল্লা ওমর এবং তার অনুসারীদেরকে আরও শক্তিশালী করেছে, তাদের কাছে আগে যা ছিলনা এখন তারা সেটাও অর্জন করে নিয়েছেন।

কেউ যদি বলেন যে সন্ত্রাসবাদ শেষ করার লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফল হয়েছিল, তবে অ্যামেরিকার চোখে সন্ত্রাসী ছিল শাইখ ওসামা, আরব মুজাহিদিন এবং তালিবান। দশ বছর আগে শাইখ ওসামা শহীদ [ইনশা আল্লাহ] হয়েছেন। কিন্তু তাঁর গড়ে তোলা মুজাহিদ বাহিনীটি কি শেষ হয়ে গেছে? বা বিশ্বব্যাপী তাদের বিজয় অভিযান কি থেমে গেছে? তারা কি তালিবানদের প্রতিপত্তি শেষ করতে পেরেছে? নিশ্চই এখন উত্তর আসবে না। তবে এ কথা সত্য যে, প্রথমদিকে অ্যামেরিকা ও তার মুরতাদ দোসর পাকিস্তান মিলে বেশ মুজাহিদকে শহীদ করে দিতে সমর্থ হয়েছিলো এবং সাময়িক ভাবে তারা মুজাহিদদের পিছু সরে যেতে বাধ্য করতে সমর্থ হয়েছিল।

কিন্তু দেখা যাচ্ছে মাত্র ২০ বছর আগে সন্ত্রাসী তকমা দেয়া তালিবানের সাথেই কথিত গনতন্ত্রের ধারক অ্যামেরিকা আজ চুক্তি করতে বসেছে! তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে ২০ বছর আগে কি তাদের বাধা দিয়েছিলো আলোচনার টেবিলে বসতে? তাদের উন্মত্ত অহংকার আর তাদের আখ্যা দেয়া সন্ত্রাসবাদ বা টেরোরিজম স্বার্থপর একটি প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই না! তারা এটিকে তাদের নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য এবং নিজেদের জঘন্য হত্যাকান্ড আড়াল করার জন্য ব্যাবহার করে। আজ প্রমানিত যে, সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী আসলে অ্যামেরিকা নিজেই!

অ্যামেরিকার আরেকটি কথিত এজেন্ডা ছিলো আফগানিস্তানে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। নারীদের আধুনিকায়ন করা। অথচ এটি প্রমানিত তারা নারীর অধিকার বলতে সর্বোচ্চ বুঝে থাকে, পোশাক সংক্ষিপ্ত করতে থাকা, বেহায়াপনা এবং অশ্লিলতার প্রচার এবং প্রসার ঘটানো। যে অ্যামেরিকা নারীদের কাজের অধিকারের কথা বলে, সেই অ্যামেরিকা ২০ বছরে আফগানিস্তানের ভউত অবকাঠামো উন্নয়নে তেমন কোন কাজই করেনি। ইন্ডিপেন্ডেন্ট রিভিউ কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১০ বছরে শুধু মার্কিন সামরিক বাহিনীতেই কর্মরত প্রায় ৫ লক্ষ ৯ হাজার সৈন্য যৌন হেনস্থার শিকার হয়েছে। চিন্তা করুন তাদের সামরিক বাহিনীতেই যদি এই অবস্থা হয়ে থাকে, তাহলে যেসব দেশে তারা আগ্রাসন চালিয়েছে সেখানে তারা কত নারীর সম্ভ্রমহানি করেছে। সারকথা এই যে, অ্যামেরিকার মুখে নারী অধিকার আর শেয়ালের কাছে মুরগি রাখা একই কথা! তারা তো এমন নির্লজ্জ এক জাতি যারা নিজেদের কাজের সাথীকেও ধর্ষণ করতে দ্বিধা করেনা! এমনকি নিজেদের বন্ধুদের স্ত্রীরাও তাদের কাছে নিরাপদ নয়। এরাই কিনা আমাদের নারী অধিকারের সবক দেয়!

অ্যামেরিকার লক্ষ্য যদি সত্যিই তাদের ভাষায় সন্ত্রাসবাদ নির্মূল ও নারীর অধিকার রক্ষা করা হয়ে থাকে, তবে এতে তারা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে (বরং তারাই এসব অপরাধের সাথে সবাচাইতে বেশি জড়িত)। আর যদি তা না হয়, তবে প্রশ্ন আসে তারা কেন আফগানে এলো এবং কেন তারা এদেশে এত লোককে শহীদ করেছিল?

উপরের লক্ষ্যগুলোর মধ্যে একটিও অ্যামেরিকার লক্ষ্য ছিলনা, বরং এগুলো হচ্ছে সাধারন মানুষকে ধোঁকায় ফেলে রাখার একটি মন্ত্র মাত্র। তবে অ্যামেরিকার জন্য মাথা ব্যথা ছিল তৎকালীন ইসলামী ব্যবস্থা, আর তখন অ্যামেরিকার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ইসলামী চিন্তাভাবনা, ইসলামের পুণরুত্থান ও নব শক্তিকে দমিয়ে দেওয়া। কিন্তু তারা এই লক্ষ্যেও ব্যার্থ হয়েছে। কেননা এখন এক আফগানিস্তানের স্থলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মুজাহিদগণ বহু অফগানিস্তান আর ইসলামিক ইমারাত প্রতিষ্ঠা করে চলছেন।

তালিবান ও আল-কায়েদার অন্য একটি লক্ষ্য ছিল আমেরিকা সম্পর্কে অপরাজেয় যে ধারণা মানুষের মনে গেঁথে দেওয়া হয়েছিল তা চুর্ণ করে দিয়ে বিশ্বের দরবারে সেই সন্দেহ দূর করা। বরতমানে তালিবানরা বিশ্বের সাথে একটি রাজনৈতিক সম্পর্কও তৈরি করে চলছেন। আর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেশে সাধারন জনগণও এখন মুজাহিদদের সমর্থন ও সহায়তা করে যাচ্ছেন, তারা মুজাহিদদের বিজয়ে আনন্দ প্রকাশ করছেন। শরিয়াহ্ শাসন ফিরিয়ে আনতে তারা ত্বাগুত সরকারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন। নিশ্চই এটি মুজাহিদদের জন্য বিশাল এক বিজয়। আলহামদুলিল্লাহ্।

সংক্ষেপে এই যুদ্ধে কুফ্ফার জোটের প্রধান লক্ষ্য ছিল কয়েক দশক ধরে নিজের হাতে তৈরি করা কুফরি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা। কেননা সে সময়ে এই কুফরি ব্যবস্থার বিপরীতে ফিরে আসতে শুরু করেছিল ইসলামী শাসন ব্যাবস্থা, ৯০ দশকের শেষভাগে যার সূচনা করেছিলেন তালিবান মুজাহিদগণ। যার ফলে কুফ্ফার বিশ্বের প্রয়োজন ছিল যেকোনও মূল্যে এই ব্যাবস্থাকে উৎখাত করা। সেই লক্ষ্যে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালায় সম্মিলিত কুফ্ফার জোট বাহিনী। কিন্তু অ্যামেরিকার এই যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী ইসলামিক এই ব্যাবস্থা আরও প্রসারিত হয়েছে মহান রবের সাহয্য আর আপন আধিপত্য ও শক্তি নিয়ে। বিপরীতে, গণতন্ত্র নামক কুফরি শাসন ব্যাবস্থা বিশ্বে ঘৃণিত ও লাঞ্ছিত হয়ে পড়েছে। এটি একটি অর্থনৈতিক সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছে। এর জাতিরা তাদের শাসকদের প্রতি বিশ্বাস হারিয়েছে। ইসলামপন্থী গণতান্ত্রিক দলগুলোও মানুষকে নিরাশ করেছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই দলগুলো কুফরি গণতন্ত্রের মাধ্যমে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর কোথাও ইসলামি হুকুম কায়েম করে জ্বলন্ত প্রমান মিশরের ইখওয়ানুল মুসলিম।

আজকের ইসলামপন্থী গণতান্ত্রিক দলগুলোর আদর্শ ও পথ পদর্শক বা তারা যাদের মানহাযের উপর এই গণতন্ত্রের মাধ্যমে ইসলামিক হুকুমত কায়েমের দিবাস্বপ্ন দেখে সেটি হচ্ছে মিসরের ইখওয়ানুল মুসলিমিন (ব্রাদারহুড)। হাসানুল বান্নার নেতৃত্বে ১৯২৮ সালে মিশরের ইখওয়ানুল মুসলিমিনের যাত্রা শুরু করে। এরপর মিসরে সবচেয়ে শক্তিশালী, সবচেয়ে বেশি জনসমর্থন নিয়ে দীর্ঘ ৮৪ বছর পর অর্থাৎ ২০১২ সালে প্রথমবারের মত সংগঠনটির কোনো নেতা মিসরের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ক্ষমতায় থাকাকালীন ইসলামিক গণতন্ত্রপন্থী এই দলটিও পারেনি এত বিপুল জনবল ও শক্তি নিয়েও ইসলামি হুকুমত বাস্তবায়ন করতে। বরং এক বছর যেতে না যেতেই সামরিক হস্তক্ষেপে ক্ষমতাচ্যুত হয় দলটির পক্ষহতে মিসরের ক্ষমতায় যাওয়া প্রেসিডেন্ট মুরসি।

বিপরীতে মোল্লা মোহাম্মদ ওমর মুজাহিদের (রহিমাহুল্লাহ) নেতৃত্ব ১৯৯৪ সালে মাদ্রাসার ছাত্রদের নিয়ে শুরু হওয়া তালিবান আন্দোলন আল্লাহ্ প্রদত্ত দ্বীন কায়েমের সঠিক পথ জিহাদের মাধ্যমে মাত্র ২ বছরের মাথায় ১৯৯৬ সালে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল বিজয় করেন। এরপর ২০০১ সালের ৭ অক্টোবরের আগ পর্যন্ত আফগানিস্তানে ইসলামিক হুকুমত কায়েম রাখেন। অতঃপর মার্কিন আগ্রাসনের ফলে সাময়িক সময়ের জন্য তালিবানরা ক্ষমতাচ্যুত হলেও আবারো কাবুলের আকাশে শুনা যাচ্ছে তালিবানদের বিজয়ের প্রতিধ্বনি। অনুরূপ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই মুজাহিদগণ জিহাদের এই আওয়াজ আজ বুলন্দ করছেন, মালি ও সোমালিয়া সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে বিশাল এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তাঁরা ইসলামিক শরিয়াহ্ ভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। আলহামদুলিল্লাহ্

যুবকরা আজ কুফরি গণতন্ত্রের মোহ থেকে বেরিয়ে জিহাদের দিকে ফিরে আসছে, ফলে মুসলিম যুবকরা আজ দেশে দেশে জিহাদ ও খিলাফাহ্’র আওয়াজ তুলছে, জিহাদের বরকতময় কাফেলায় শরিক হচ্ছে। যেই আওয়াজের প্রতিধ্বনি শুনা যাচ্ছে- শাম, ইয়ামান, পাকিস্তান, সোমালিয়া, কেনিয়া, নাইজেরিয়া, নাইজার, মালি, বুর্কিনা-ফাসো, আইভরি-কোস্ট ও আল-জাজায়ের সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেশে। যার ছোয়া থেকে বাদ পড়ছে না বাংলাদেশ সহ উপমহাদেশের অন্যান্য দেশগুলোও।

ইমামুল মুজাহিদিন শহিদ শাইখ উসামা বিন মুহাম্মাদ রহিমাহুল্লাহ বলেন- যে বা যারাই প্রতিরোধ ও প্রস্তুতি ব্যাতীত অন্য কোনো মাধ্যমে ইসলামের নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়নের কথা বলেন তারা মুজাহিদিনের অবমাননা তো করেনই, একই সাথে উম্মাহকে অবাস্তব কল্পনার চোরাবালিতে আটকে ফেলেন।


বিজয়ের পদধ্বনি- ২ || বিশ বছর মেয়াদী আফগান যুদ্ধ ও আমাদের শিক্ষা

২০০১ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হয়েছিল আফগানে মুসলিমদের বিরুদ্ধে নতুন এক ক্রুসেড। এই যুদ্ধের ঘোষণাকালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ বলেছিল- এই যুদ্ধে হয় আপনি আমাদের (ক্রুসেডের) পক্ষে থাকবেন, নয়তো সন্ত্রাসীদের (মুজাহিদদের) পক্ষে। মূলত এই বার্তার মাধ্যমে বুশ ঈমান ও কুফরের দু’টি তাঁবুকে আলাদা করে দিয়েছিল। সে তখন মুজাহিদদের পরাজিত করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেছিল। অপরদিকে মুজাহিদগণও মহান আল্লাহর উপরে অটল বিশ্বাস রেখে আগ্রাসী কাফেরদের মুকাবেলা করে গেছেন পাহাড়সম দৃঢ়তা নিয়ে।

অ্যামেরিকা ও তার মিত্র জোটের হামলায় প্রথম দিকে মুজাহিদ বাহিনী কৌশলগত কারণে পিছু হটে বিস্তীর্ণ আফগান অঞ্চলে মিলিয়ে যান। একেই অ্যামেরিকা চোখ ধাঁধানো সফলতা মনে করে! নিজেদের বিজয় উল্লাসের ঘোর কাটতে বেশী সময় লাগেনি তাদের। মুজাহিদ বাহিনী আবার নতুন উদ্যমে আক্রমন শুরু করে। সেই থেকে নিয়ে ২০ বছর। কথিত পরাশক্তি অ্যামেরিকার সবচেতে দীর্ঘমেয়াদি এবং সবচেয়ে ব্যায়বহুল যুদ্ধ!

অবশ্যই সময় সাক্ষ্য দেয় এবং আল্লাহর ওয়াদাই সর্বদা সত্য হয়। ইতিহাসের প্রতিটি পাতায় লিপিবদ্ধ কাফেরদের পরাজয়ের মত অ্যামেরিকা এবং তার মিত্র বাহিনীও পরাজয়ের স্বাদ আস্বাদন করল। শুধু তাই নয় প্রবল অহংকারে উড়ে আসা অ্যামেরিকা আজ পরাজিত নেড়ি কুকুরের মত ময়দান ত্যাগ করছে। নিজেদের লজ্জা ও ভীতি গোপন করার জন্য তারা পালিয়ে গেছে রাতের আঁধারে!

নিশ্চয়ই এই বিজয় আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। আমরা শুধু গল্প বলার জন্য বিজয় স্মরণ করিনা বরং তা আমাদের জন্য এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য শিক্ষার উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

এপ্রেক্ষিতে আমাদের স্মরণ হয় মক্কা বিজয়ের কথা –

মক্কা বিজয়ের সময় রাসুলুল্লাহ ﷺ ঘোষণা দেন, “আজ যারা নিজ নিজ ঘরে অবস্থান করবে এবং দরজা বন্ধ রাখবে, তারা নিরাপদ। যারা মক্কার নেতা আবু সুফিয়ানের ঘরে অবস্থান করবে, তারাও নিরাপদ। পবিত্র কাবা ঘরে যারা আশ্রয় গ্রহণ করবে, তারাও নিরাপদ। এভাবে বিশ্বনবী মক্কাবাসীদের প্রতি কোনরূপ প্রতিশোধ গ্রহণ না করে মুসলমানদের নিরাপত্তার স্বার্থে ও শৃঙ্খলার জন্য শর্তসাপেক্ষে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন।” [১]

এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে, নববী সুন্নাহ অনুসরণে, তালিবান মুজাহিদদের একের পর এক সামরিক বিজয় শুরু হওয়ার পর থেকে ইমারতে ইসলামিয়ার পক্ষ হতে সাধারন ক্ষমা ঘোষণা করা হতে থাকে। বলা হয়,
“যারা ক্রুসেডার অ্যামেরিকা ও তাদের গোলামদের হয়ে কাজ ছেড়ে দিবে, যারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চাইবে এবং যারা তাওবা করে মুজাহিদদের কাতারে শামিল হবে তারা সবাই মুক্ত। আমরা তাদেরকে নিজেদের ভাই হিসাবে গ্রহন করে নিবো। তাদের ও তাদের পরিবারের নিরাপত্তা দিবো”

আল্লাহু আকবার! ইমারতে ইসলামিয়া ও আমীরুল মু’মিনিনের এইধরণের সাধারন ক্ষমা ঘোষণার পর থেকে প্রতিমাসে হাজার হাজার কাবুল সেনা তাওবা করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছে, অনেকেই আবার তালিবানদের কাতারে যোগ দিচ্ছেন। যার ফলে মুজাহিদগণ বিনা যুদ্ধ আর রক্তপাত ছাড়াই অনেক জেলা, কেন্দ্র ও সামরিক ঘাঁটি বিজয় করছেন।

১০ হাজার সাহাবির বিশাল মুসলিম বাহিনী বিশ্বনবী ﷺ এর সফল নেতৃত্বে একরকম বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয় করেন। দীর্ঘ ১০ বছর পর নিজ মাতৃভূমি ও পবিত্র মক্কার মুক্ত বাতাসে প্রশান্তির সুঘ্রাণ লাভ করেন রাসুলুল্লাহ ﷺ। কৃতজ্ঞতায় সেজদায় লুটিয়ে পড়েন প্রিয় কাবা চত্ত্বরে। আল্লাহু আকবার!

এরপর তাঁরা দাওয়াহ্ ও জিহাদের মহান লক্ষ্য নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছিলেন এক ভূখণ্ড থেকে অন্য ভূখণ্ডে।

আজ মুজাহিদগণও বিনা রক্তপাত আর যুদ্ধ ছাড়াই প্রতিসপ্তাহে কয়েক ডজন করে জেলা বিজয় করছেন। ২০ বছর পর পুনরায় এসব ভূমিতে মুজাহিদগণ বিজয় আর প্রশান্তির সুঘ্রাণ লাভ করছেন। মহান রবের কৃতজ্ঞতা আদায় করতে মুজাহিদগণ সেজদায় লুটিয়ে পড়ছেন।

আজ প্রমানিত, কৌশল হিসেবে প্রথম দিকে মুজাহিদদের পিছু হটা কোন পরাজয় ছিল না, বরং এটা ছিল এক যুদ্ধ-কৌশল, যার লক্ষ্য ছিল নিজেদেরকে পূর্বের চেয়ে আরও শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ করে পুনরায় আঘাত হানা । আর আমরা আজ তার উজ্বল প্রমাণও দেখতে পাচ্ছি।

আমাদের সেই সময়ের কথাগুলোও অনেক মনে পড়ে, যখন মানুষ পাহাড়ী তালিবান আর আল-কায়েদা মৌলভীদের নাম উচ্চারণ করতেও অনেক ভয় পেত। আলহামদুলিল্লাহ্, এখন সময় সেই পাহাড়ী মোল্লাদের! মুসলিমরা আজ গর্বভরে সেই পাহাড়ী মোল্লাদের নাম নিচ্ছেন। তারা মুজাহিদদের সংবাদ আর বার্তাগুলো এক কান থেকে অন্য কানে পৌঁছে দিচ্ছেন। জিল্লতির সময়ে একটুকরো সম্মানের হারানো স্বাদ অনুভব করছেন! আলহামদুলিল্লাহ।

যেখানে বছরের পর বছর ধরে অ্যামেরিকা ও হলুদ মিডিয়াগুলো তালিবানকে সন্ত্রাসী বলে বেড়াত, এখন সেই তালিবানদের সাথেই তারা চুক্তি, আলোচনা করতে বসেছে।
এই বৈঠক শুরুর মাত্র কয়েকমাস আগেও যেখানে তালিবানদের দখলে আফগানিস্তানের অর্ধশতাধিক জেলা ছিল। সেখানে এখন তা ছাড়িয়ে গেছে আড়াই শতাধিক জেলা কেন্দ্রকেও। তালিবানদের সাম্প্রতিক এই বিজয় মু’মিনদের হৃদয়কে যেমনিভাবে করছে প্রশান্ত তেমনিভাবে কুফ্ফার ও ত্বাগুতদের অন্তরে ভীতি এবং ত্রাস সৃষ্টি করেছে।

বর্তমানে তালিবানদের সফলতা ও বিজয় নিয়ে কথা বলার সময় অনেক মুসলিম আলিমদের এই কথাটা অধিকহারে প্রচার করতে দেখা যাচ্ছে যে, ” ১৯৯৬ এর তালেবান আর বর্তমান তালিবান এক নয়। দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য লক্ষ করার মতো। বর্তমান নেতৃত্ব অনেকটা পরিপক্ব, তারা প্রতিবেশীসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে ইচ্ছুক। তারা রাজনৈতিক সমাধানেই বেশি আগ্রহী।”

এটা ঠিক যে ৯৬ এর পর তালিবানের রাজনৈতিক এবং সামরিক বিভাগে অনেক পরিবর্তন এসেছে। কেননা তালিবানরা এখন সামরিক শক্তির দিক থেকে পূর্বের চেয়ে অনেক শক্তিশালী ও একটি দক্ষ সামরিক বাহিনী হিসাবে গড়ে উঠেছেন। পাশাপাশি তারা রাজনীতির ময়দানেও নিজেদের সক্ষমতা ও যোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছেন। আলিমরা যদি বিষয়টিকে এভাবে প্রকাশ করতেন তাহলে মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু তারা এই পরিবর্তনের দ্বারা কেমন যেন এটাই বুঝাতে চাচ্ছেন যে, তালিবানদের পূর্বেকার নেতৃত্ব অপরিপক্ব ছিলেন, তারা প্রতিবেশী ও বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে ইচ্ছুক ছিলেন না।

তাদের এমন চিন্তাধারা এটাই প্রমাণ করে যে, তারা ৯৬ এর তালিবানের ইতিহাসই ভালোভাবে জানেনই না। অথচ তালিবানরা ৯৬ থেকেই সব দেশের সাথে কূটনীতিক সম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করার চেষ্টা করেছেন, সব দেশেই নিজেদের দূতাবাস নিয়োগ করতে চেয়েছিলেন। অ্যামেরিকায় ৯/১১ হামলা ও আফগানে মার্কিন আগ্রাসনের বিষয়টি নিয়েও তালিবানরা কূটনৈতিকভাবে সমাধান করার জন্য অ্যামেরিকাকে আহ্বান করেছিলেন। কিন্তু দাম্ভিক অ্যামেরিকা তখন কূটনৈতিক সমাধানে যেতে রাজি হয়নি।

অপরদিকে ৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত মাত্র ৩ টি দেশ ছাড়া কোনো দেশই তালিবানদের নবপ্রতিষ্ঠিত ইসলামিক ইমারতকে স্বীকৃতি দিতে ও সেসব দেশে তালিবানদের দূতাবাস নিয়োগ দিতে রাজি হয়নি। বরং সব দেশই তখন চেয়েছিল নতুন এই রাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে। কেননা তালিবানদের এই ইসলামিক রাষ্ট্র ব্যাবস্থা ফলে কুফরি গণতন্ত্রের নোংরা রাষ্ট্র ব্যবস্থার নষ্টামি জনগণের সামনে প্রকাশিত হতে শুরু করেছিল। তাই ২০০১ সালে যখন অ্যামেরিকা ইসলামিক ইমারত অফ আফগানিস্তানকে ধ্বংস করতে যুদ্ধ শুরু করে তখন এই দেশগুলো অ্যামেরিকার সাথে একজোট হয়ে তালিবানদের উপর হামলা চালায়। যে তিনটি রাষ্ট্র ২০০১ সালের আগে তালিবানদের স্বীকৃতি দিয়েছিল, তারাও তখন অ্যামেরিকার পতাকাতলে এসে একত্রিত হয়। এক্ষেত্র পাকিস্তান তার আকাশ ও স্থলপথ অ্যামেরিকার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়, সৌদিআরব অ্যামেরিকাকে তেল আর অস্ত্রের যোগান দেয়। কাতারসহ অন্যান্য আরব দেশগুলোও তাদের বিমান ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের অনুমতি দেয় অ্যামেরিকাকে।

এখন হয়তো প্রশ্ন জাগতে পারে, তখন তালিবানের সাথে সম্পর্ক রাখতে অনাগ্রহী দেশগুলো এখন কেন তালিবানদের সাথে সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী?

কারণ আজ বাস্তবতার বিচারে প্রেক্ষাপট পালটে গেছে। কথিত গন্তন্ত্রের মন্ত্র বাতাসে মিলিয়ে গেছে আর সেখানে কালিমার পতাকা উড়ছে। বাতিলের প্রবল শক্তি ২০ বছর যুদ্ধ করার পরেও যখন পরাজিত হয়েছে তখন আলোচনায় বসা ছাড়া তাদের আর কোনো পথ আছে!

সুতরাং এসব কিছু পূর্বের তালিবান আর বর্তমান তালিবানের বিষয় নয়, বরং এগুলো ৯/১১ হামলা এবং তালিবান এবং আল-কায়েদার মধ্যকার দৃঢ় সম্পর্ক আর সামরিক শক্তির প্রভাব মাত্র। তাইতো দোহা চুক্তির সময় প্রতিবেশী দেশগুলো অ্যামেরিকার মাধ্যমে এই চুক্তি করিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল যে, আফগানের ভূমি ব্যবহার করে কেউ যেন পুনরায় সাপের মাথা অ্যামেরিকা ও তাদের দালাল রাষ্ট্রগুলোতে আক্রামন না করে। দোহা চুক্তির এই অংশটিতে বিবেকবানদের জন্য রয়েছে চিন্তা করার মত অনেক বিষয়, যা তাদের সামনে আল-কায়েদা ও তালিবানদের মধ্যকার সম্পর্ক এবং তাদের সামরিক সক্ষমতার বিষয়ে অনেক তথ্য প্রদান করবে।

সর্বশেষ, এখন আফগানিস্তান থেকে দখলদার বিদেশী সেনাদের বিদায় পুরো বিশ্বের মুসলিমদেরকে এই বার্তাই দিচ্ছে যে, আগ্রাসী শক্তি যতই প্রযুক্তিনির্ভর কিংবা পরমাণু শক্তির মালিক হোক না কেন, যদি মুসলিমরা আল্লাহ্ তায়ালার উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থার সাথে সঠিক পদ্ধতিতে দ্বীন কায়েমের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়, তাহলে ঈমানদার ও সাহসী প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সামনে দাঁড়ানোর ক্ষমতা কোনটিই ইসলামের শত্রুদের থাকে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ বিজয় লিখে রেখেছেন এবং পরাজয় ও লিখে রেখেছেন। মুজাহিদ বাহিনী যদি সাময়িক পরাজয় বরণ করেও সেটি আল্লাহর ইচ্ছার প্রকাশ মাত্র, কিন্তু শেষ বিজয় তো শুধু মুমিনদের জন্য। সেখানে কাফেরদের কোন অংশ নেই!

টীকা:
[১] কিছু বিশেষ অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল

বিজয়ের পদধ্বনি- ৩ || যুগে যুগে সাম্রাজ্যবাদের ত্রাস আফগানিস্তান

ইতিহাস, ঐতিহ্য আর প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর আফগানিস্তানকে প্রতি শতাব্দীতেই কোন না কোন পরাশক্তি নিজেদের দখলে নেয়ার পায়তারা করেছে। সাম্রাজ্যবাদী লুটেরা কঠিন চক্রান্ত করেছে, নিজেদের অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র আর সর্বশক্তি নিয়ে আফগান পাহাড়ি মোল্লাদের বিরুদ্ধে এক অসময় লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, আফাগানিস্তানের এই ভূমি তাদেরকে তিক্ত পরাজয়ের স্বাদ ব্যাতিত আর অন্য কিছুই ফেরত দেয়নি।

যুগে যুগে ইতিহাস পরিবর্তনকারী বীর মুজাহিদ-গাজীদের জন্মভূমি আফগানিস্তানের এই জমিন কব্জা করতে আধুনিক রণসজ্জায় সজ্জিত হয়ে সাবেক সুপারপাওয়ার ব্রিটিশরা লড়েছে, পরাশক্তি রাশিয়া চেস্টা করেছে, আর দীর্ঘ বিশ বছর ধরে লড়াই করে মার্কিন-ন্যাটো জোটের শোচনীয় পরাজয় তো আমাদের সামনে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট!

এসব সাম্রাজ্যবাদীদের কবল থেকে মুসলিমদের দ্বীন ও ঈমানকে হেফাজত করতে, ঘুমন্ত উম্মাহকে জাগিয়ে তুলতে, উম্মাহর নেতৃত্ব ও ইসলামের গৌরবকে ফিরিয়ে আনতে এবং আল্লাহ্’র জমিনে আল্লাহ্ দ্বীনকে বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা জারি রাখতে আল্লাহ্ তা’আলা যুগে যুগে একজন রাহবার পাঠিয়ে থাকেন। এমনই একজন রাহবার ছিলেন বীর মুজাহিদ আহমাদ শাহ্ আবদালী। তিনিই ছিলেন আফগানিস্তানের প্রথম স্বাধীন সম্রাট। ১৭৬১ সালে যখন ভারতের মুশরিক মারাঠা বাহিনী মুসলিমদের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করে উপমহাদেশে অখন্ড হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চলছিল, তখন এই বীর মুজাহিদ শাহ ওয়ালি উল্লাহ্ মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ. এর আহ্বানে সাড়া দিয়ে পানীপথের তৃতীয় যুদ্ধে ভারতীয় মুশরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। এই যুদ্ধে তিনি মুসলিমদের শত্রু মারাঠা মুশরিক বাহিনীকে লাঞ্চনাকর ও শোচনীয় পরাজয় উপহার দেন এবং মুসলিম ভূমি উদ্ধার করে এর বিস্তৃতি ঘটান।

এরপর ১৮৩৮ সালে ইংরেজ বা ব্রিটিশরা আফগানিস্তানে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে যুদ্ধ শুরু করে। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের দুই বছরের মাথায় ব্রিটিশরা দেশটির রাজধানী কাবুল দখলে নেয়। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের জন্য আফগান যুদ্ধ ও তার রাজধানী দখলে নেয়া তাদের ইতিহাসের কালো অধ্যায়ের সূচনা শুরু করে। কেননা এসময় আফগান বীর মুজাহিদদের হাতে একে একে তাদের তিনজন সেনাপ্রধান নিহত হয়। ১৮৪২ সালে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের অপরাজেয় শক্তির ইতিহাসে কালো সীলমোহর মারেন আফগান মুজাহিদরা। মুজাহিদদের একের পর এক হামলায় সে বছর কাবুল ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করে ব্রিটিশ সৈন্যরা। জানা যায় ব্রিটিশ বাহিনীর একজন ব্যাতিত বাকি সকল সৈন্যকে তাদের আগ্রাসী মনোভাব এবং জুলুমের যথার্থ পাওনা বুঝিয়ে দেয়া হয়।

এরপর ১৮৭৮ সালে আফগানিস্তানে ফের আগ্রাসন চালায় ব্রিটিশ বাহিনী। তারা রাজধানীসহ দেশের সিংহভাগ এলাকা দখল করে নেয়। এসময় ১৮৮০ সাল পর্যন্ত আফগানের বিভিন্ন অঞ্চলে আফগান মুজাহিদদের সাথে তীব্র লড়াই হয় ব্রিটিশ বাহিনীর। ঐবছরের ২৭ শে জুলাই আফগানিস্তানের কান্দাহার প্রদেশের মাইওয়ান্দ গ্রামে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশরা আফগান পাহাড়ি মোল্লাদের বিরুদ্ধে শতাব্দীর পট পরিবর্তনকারী এক অসম যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। সে যুদ্ধে আইয়ুব খানের নেতৃত্বে স্বাধীনচেতা আফগান মুসলিমরা আধুনিক অস্ত্রে সমৃদ্ধ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জর্জ বুড়োসের নেতৃত্বাধীন ব্রিটিশ-ভারতের দুই ব্রিগেড সৈন্যদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে।

যুদ্ধের আগের দিন অর্থাৎ ২৬ শে জুলাই দুপুর বেলা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জর্জ বুড়োস সংবাদ পান স্বাধীনচেতা আফগান মুসলিমরা সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ আগ্রাসন প্রতিহত করতে অসীম শৌর্যবীর্যে মাইওয়ান্দের দিকে এগিয়ে আসছে।

জর্জ সিদ্ধান্ত নেয় পরদিন ২৭ জুলাই ভোরে মাইওয়ান্দে আগেভাগেই পৌছে আফগান মুসলিমদের দুর্ভেদ্য প্রতিরোধ শক্তিকে গুড়িয়ে দিবে। কিন্তু পরদিন ঘটে তার ঠিক উলটো ঘটনা।

সকাল ১০ টা নাগাদ তুমুল যুদ্ধ শুরু হলে আফগান মুসলিমদের চতুর্মুখী আক্রমণে ব্রিটিশ-ভারতীয় সৈন্যরা ধরাশায়ী হয়ে পড়ে। আইয়ুব খান বাহিনীর অতর্কিত হামলায় তাদের রণকৌশন ভেস্তে যায়। সে যুদ্ধে ব্রিটিশ-ভারতের ২১ জন উর্ধতন অফিসার সহ ৯৬৯ জন সৈন্য নিহত হয়; ৮ অফিসার সহ ১৭৮ জন সৈন্য আহত হয়। তাছাড়াও মাইওয়ান্দের সে যুদ্ধে বহু ব্রিটিশ-ভারতীয় সৈন্য বীর আফগানদের নিকট আত্মসমর্পণ করে।

মাইওয়ান্দ যুদ্ধে বাজেভাবে হেরে ব্রিটিশরা মনোবল হারিয়ে ফেলে। তাদের সাম্রাজ্যবাদী অগ্রযাত্রা ব্যহত হয়। এরপর ব্রিটিশ বাহিনী মুজাহিদদের হামলার ফলে গান্ধামাক চুক্তির মাধ্যমে পুনরায় আফগান ছাড়তে বাধ্য হয়।

এরপর ১৯৭৯ সালে আফগানের মুরতাদ সরকারের সহায়তায় তৎকালীন পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া) অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ১ লক্ষ ৫ হাজার সৈন্য নিয়ে আফগানিস্তানে সামরিক আগ্রাসন চালায়। সোভিয়েত তাদের এই আগ্রাসনের অনেক আগ থেকেই আফগানিস্তানের সামরিক ও সরকারের উচ্চপদস্থ প্রতিটি স্থানেই বসিয়ে রেখেছিল তাদের গোলামদের। যেমনটি আমরা বর্তমানে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখতে পাচ্ছি। এমন অবস্থায় নিজেদের দ্বীন ঈমান ও ভূমি রক্ষায় তৎকালীন পরাশক্তির বিরুদ্ধে পুনরায় হাতে অস্ত্র তুলে নেন আফগানের তাওহিদী মুসলিমরা। এভাবেই ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত আগ্রাসী সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে নিজেদের সমর্থের সবটুকু দিয়ে রুখে দাড়ান বীরের জাতি আফগান মুসলিমরা। এসময় তাদের সাহায্যে জিহাদের এই ভূমিতে আগমন ঘটে শাইখ শহীদ শাইখ ড. আব্দুল্লাহ আযযাম, শহীদ শাইখ ওসামা বিন লাদেন রহঃ ও শাইখ আইমান হাফিজাহুল্লাহ্’র মত মহান ব্যক্তিদের। তাঁদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে ছুটে আসতে থাকেন তরুণরা। তাঁরা আফগানীদের কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে এক অসম যুদ্ধ শুরু করেন। আরব-আজমের জানবাজ মুজাহিদদের দীর্ঘ ১০ বছরের অসম লড়াইয়ের ফলে ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগান ছাড়তে বাধ্য হয়। মুজাহিদদের কাছে এই পরাজয়ের পর পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয় ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে, পতন ঘটে সমাজতন্ত্র নামক কুফরি জীবন-ব্যবস্থার।

সর্বশেষ ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর আফগানিস্তানে আগ্রসন চালায় পরাশক্তির দাবীদার ক্রুসেডার অ্যামেরিকা, ন্যাটো জোট ও তাদের গোলাম সৈন্যরা। যা আজ ২০ বছর যাবত চলমান রয়েছে। ইতিহাস ঘুরতে থাকে এবং সত্য লিপিবদ্ধ করতে থাকে, আবারো পূর্বের আগ্রাসী শক্তিগুলোর মতই পরাজয়ের স্বাদ নিয়ে ফিরে যাচ্ছে কথিত পরাশক্তি অ্যামেরিকা!

বিজয়ের পদধ্বনি- ৪ | সমাজতন্ত্রের পতন ও তালেবানদের নতুন ইসলামিক সম্রাজ্যের উত্থান-১

আফগানিস্তানে পরাজিত হয়ে সোভিয়েত ইউনিউয়ন পালিয়ে যায়। ক্ষমতালোভীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয় আফগানিস্তান। ৩টি শক্তিশালী গ্রুপ হেকমতিয়ার, মাসুদ ও নজিবুল্লাহ’সহ আবদুর রশিদ-দোস্তমদের মত লোকদের হাতে গড়ে উঠা ছোট ছোট ৯টি মিলিশিয়া গ্রুপের ফলে বিভক্ত হয়ে পড়ে আফগানিরা। এসব ক্ষমতালোভীদের ফলে ৯০ দশকের আফগানিস্তান নিপীড়ন, স্বৈরাচার এবং দুর্নীতিতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠে। ১৯৯২ সালে যার তীব্রতা আরো কয়েকগুন বেড়ে যায়।

এসময় হেকমতিয়ার এবং দোস্তুমের বাহিনীসহ আফগানিস্তানের বিভিন্ন দল পাকিস্তানের পেশোয়ারে বৈঠক করে।উদ্দেশ্য জোটসরকার গঠন করে প্রশাসনের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া। বৈঠকের আগেই ১৯৯২ সালের মার্চ মাসে হেকমতিয়ারসহ অন্যদলগুলো এই বৈঠক বয়কট করে। তাদের দাবি কিছু নেতা, বিশেষ করে রব্বানী এবং মাসুদ, হিজব-ই-ইসলামীকে খুব ছোট জায়গা দেবার পরিকল্পনা করছে। আবার এই প্রক্রিয়ায়, ইরান-সমর্থিত শিয়া গোষ্ঠীগুলো নতুন প্রশাসনে তাদের প্রাপ্যের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতার দাবি করেছিল। এসব কারণে জোট সরকারের মাঝে শুরু হয় তীব্র সংঘর্ষ। এসময় রাজধানী কাবুল অনেকাংশে মাসুদ-দোস্তমের নিয়ন্ত্রণে ছিল। হেকমতিয়ার, শহরের দক্ষিণে ছিল, আর হিজব-ই-বাহাদেত শহরের পশ্চিমে শিয়া বসতিগুলো নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। রাজধানীতে সায়াফের অনুগত বাহিনীও ছিল। এসময় কাবুলে সায়াফ গ্রুপ এবং হিজব- ই- বাহাদেতের মধ্যে শুরু হয় সংঘর্ষ। ফলে দিনে এক গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করলেও রাতের কাবুল নিয়ন্ত্রণ করত অন্য গ্রুপ।

অপরদিকে হেকমতিয়ার, রব্বানী, মাসুদ ও দোস্তুম একে অপরকে অভিযুক্ত করতে থাকে যে, তারা কাবুলে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র করছে। ফলে ১৯৯২ সালের মে মাসে, হিজব-ই-ইসলামী দক্ষিণের পাহাড় থেকে কাবুলে গোলাবর্ষণ শুরু করে। দোস্তুম ও মাসুদের বাহিনীও এসময় হিজব-ই-ইসলামীর নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলগুলোতে বোমা বর্ষণ করে। উভয় পক্ষই বলেছিল যে তারা জনগণকে নয়, শত্রু সামরিক বাহিনীকে টার্গেট করছে। কিন্তু তাদের এই বোমাবর্ষণের কারণে কাবুলের জনগণ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। বেসামরিক আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যায়, হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারান। এই দলগুলোর মাঝে এভাবে ক্ষমতার লড়াই চলতে থাকে ১৯৯৩ সালের মে মাস পর্যন্ত। এরপর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত থাকলেও ১৯৯৪ সালের জানুয়ারিতে পুনরায় কাবুলে যুদ্ধ শুরু হয়। এ যুদ্ধ ছিল পূর্বের তুলনায় আরো বেশি সহিংস। এই যুদ্ধ কাবুলকে বিধ্বস্ত, কর্তৃত্বহীন এবং অশান্তির নগরে পরিণত করে। এসব ডাকাত আর দুর্নীতিবাজ মিলিশিয়ারা আফগানদের একটি স্বাচ্ছন্দ্যময় স্বাধীন জীবন থেকে বঞ্চিত করে। ক্ষমতালোভীদের কারণে আফগানিস্তান জুড়ে শুরু হয় ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ।

আর এমন এক নাজুক পরিস্থিতেই ১৯৯৪ সালে উত্থান ঘটে তালেবান আন্দোলন নামে নতুন এক ইসলামিক শক্তির। দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম কান্দাহার প্রদেশে জন্মগ্রহণকারী মাদ্রাসা শিক্ষক মোল্লা মোহাম্মদ ওমর মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ’র (মৃত্যু ২০১৩ সাল) নেতৃত্বে শুরু হয় সাধারন ছাত্রদের নিয়ে তালেবানদের ‘আফগান সংস্কার’ আন্দোলন। মোল্লা ওমর রহিমাহুল্লাহ সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় সামনের সারি থেকে যুদ্ধ করেছিলেন। কান্দাহারে বেশ কিছু ফ্রন্টের নেতৃত্বও দিয়েছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন পরাজিত হয়ে আফগানিস্তান ত্যাগ করলে এবং আফগান মিলিশিয়াদের একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শুরু করলে তিনি নিজ এলাকায় ফিরে যান। গৃহযুদ্ধে না জড়িয়ে স্থানীয় মাদ্রাসায় ছাত্রদের কুরআন,হাদীসের দারস দিতে থাকেন।

কিন্তু অন্যান্য অঞ্চলের মতো, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কান্দাহারেও সাধারণ মানুষের উপর জুলুম করতে থাকে। কান্দাহারে দিন দিন ডাকাতি, হত্যা এবং ধর্ষণের মতো অপরাধ বাড়তে থাকে। এক সন্ত্রাসী দলের নেতা কর্তৃক ধর্ষণের ঘটনায় মোল্লা ওমর রহিমাহুল্লাহর মনে ঝড় বয়ে যায়। এসময় মোল্লা ওমর তাঁর ছাত্র এবং সাথীদের নিয়ে সন্ত্রাসীদের শায়েস্তা করতে শুরু করেন। ধর্ষণের শিকার নারীকে উদ্ধার করা হয়। এবং ধর্ষক গ্যাং লিডারকে পাকড়াও করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। জনসাধারণের আহ্বান ও সহযোগিতায় কান্দাহার জুড়ে অনুরূপ অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন মোল্লা ওমর। আর এভাবেই শুরু হয় তালেবান আন্দোলনের পথচলা।

আফগানিদের ভয়ংকর দুঃসময়ে হাল ধরেন মোল্লা মোহাম্মদ ওমর। চারিদিকে যখন অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম তখন তিনি এক পশলা ইনসাফের বৃষ্টি হয়ে আবির্ভূত হন। তালেবান মুজাহিদের আগমন আফগান জনগণের কাছে আল্লাহর পক্ষ হতে আসা করুণার ফেরেশতার চেয়ে কম ছিল না বলেও মন্তব্য করেন অনেকেই।

মোল্লা ওমরের একের পর এক সফল সিদ্ধান্তের ফলে কান্দাহারের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা মোল্লা ওমরকে তাঁর “সুশৃঙ্খল ছাত্রদের নিয়ে শহর শাসন করতে বলেন। শত শত উপজাতীয় নেতা এবং আলিমগণ মোল্লা ওমরকে তাঁদের শাসক হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। এভাবে, ১৯৯৪ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে কান্দাহার পুরোপুরি তালেবানদের অধীনে চলে আসে।

অনুরূপ পরিস্থিতিতে আশেপাশের অঞ্চলগুলোর আমন্ত্রণ ও সহযোগিতায় তালেবানরা দক্ষিণ আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে, প্রায় বিনা যুদ্ধে। কাবুলে তখন ক্ষমতালোভীদের মাঝে যুদ্ধ চলছিল। অন্যদিকে তালেবান তখন তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলে মানুষের বিরুদ্ধে এতদিন যাবত মিলিশিয়াদের কারণে সৃষ্ট নৈরাজ্যের অবসান ঘটিয়ে সামনে অগ্রসর হতে থাকে। এরপর পশ্চিম আফগানিস্তানের ঐতিহাসিক ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহর হেরাতে তালেবান মুজাহিদদের আমন্ত্রণ জানান স্থানীয়রা।

হেরাত নিয়ন্ত্রণে আসার পর কান্দাহার থেকে ইরান পর্যন্ত বিশাল সীমান্ত তালেবানদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। এই অগ্রগতি সাধনের পর, তালেবান এবং শিয়া হিজব-ই-বাহাদেত মিলিশিয়াদের মাঝে সংঘর্ষ শুরু হয় ১৯৯৫ সালে। সংঘর্ষে তালেবান মুজাহিদদের হাতে হিজব-ই-বাহাদতের নেতা আব্দুল আলী মাজারী নিহত হয়।

তালেবানদের অগ্রযাত্রায় দেশে স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে শুরু করে। তালেবানরা ইসলামি শরিয়াহ্ ফিরিয়ে আনার দৃঢ় প্রত্যয় গ্রহণ করে। ফলে কমান্ডার ইউনুস হালিম, জালাউদ্দিন হাক্কানি এবং নুরিস্তানের মোল্লা ইফদালের মতো নেতারা তাঁদের বাহিনী নিয়ে তালিবানে যোগদান করেন। এতে তালেবানের শক্তি কয়েকগুণ বেড়ে যায় এবং তাঁরা রাজধানী কাবুলের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
একের পর এক অঞ্চল বিজয় করতে করতে ১৯৯৬ সালে তালেবানরা কাবুলে পৌঁছে যায়। কাবুলের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় মাসুদ-রাব্বানী-হিকমতিয়ারের মধ্যে মতবিরোধের সুযোগ নিয়েছিল তালেবানরা। তবে ১৯৯৬ সালের মে মাসে, হেকমতিয়ার এবং রাব্বানী একমত হয়, যে শক্তি আর ক্ষমতার জন্য তারা চার বছর ধরে লড়াই করে আসছিল, তা তালেবানদের কারণে ধীরে ধীরে দূর্বল হয়ে যাচ্ছে। ফলে তারা উভয়েই তালেবানদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়।এদিকে ১৯৯৬ সালের এপ্রিলেই বিশাল এক উলামা সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে মোল্লা ওমরকে “ইমারতে ইসলামিয়া আফগানিস্তান’ এর আমীর বা আমীরুল মু’মিনিন ঘোষণা করা হয়েছিল।

যাইহোক, ক্রমবর্ধমান শক্তিশালী তালেবান হেকমতিয়ার-রব্বানী-মাসুদের বাহিনীকে অল্প সময়ের মধ্যেই পরাজিত করে ফেলে। কেননা এই দলগুলো পূর্বেই ক্রমাগত লড়াইয়ের মাধ্যমে একে অপরের শক্তি নিঃশেষ করে দিয়েছিল।
সেপ্টেম্বর মাসে সালে রাজধানী কাবুল বিজয়ের জন্য সর্বশক্তি নিয়ে লড়াই শুরু করে তালেবান। এসময় তারা স্থলপথে সাঁজোয়া যান আর ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অগ্রসর হওয়ার পাশাপাশি কাবুলে বিমান হামলাও চালায়। তালেবানদের আক্রমণের মুখে কাবুলের ক্ষমতালোভীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা একেবারেই ভেঙে পড়ে। তালেবানরা রাজধানী কাবুল বিজয় করে নেয়।
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতের পুতুল সরকার, গাদ্দার নজিবুল্লাহকে গ্রেফতার করা হয়। তাকে জনসম্মুখ মৃত্যুদণ্ড দিয়ে তার লাশ রাস্তায় ঝুলিয়ে রাখে তালেবান।

বিজয়ের পদধ্বনি- ৪ | সমাজতন্ত্রের পতন ও তালেবানদের নতুন ইসলামিক সম্রাজ্যের উত্থান-২

খেলাফতে উসমানীয়ার পতনের পর মুসলিমরা একে একে তাদের সমস্ত বিজিত অঞ্চল হারিয়ে বসে। মুসলিমদের থেকে দূরে সরে যেতে থাকে ইসলামী সভ্যতা ও  ইতিহাসের গৌরব-উজ্জল অধ্যায়। কাফির,মুশরিকেরা মুসলিমদের পবিত্র স্থানগুলোকে অপবিত্র করতে থাকে। মুসলিমদেরকে বিভক্ত করে দেওয়া হয় জাতীয়তাবাদ, সীমানার গোঁড়ামি, দেশপ্রেম এবং ভাষাতত্ত্বের নামে। এভাবেই মুসলিমদের প্রথম কিবলা মাসজিদুল-আক্বসাও দখলে নিয়ে নেয় অভিশপ্ত ইহুদীরা।

এই দীর্ঘ সময় পর আফগানিস্তানে অরাজকতা, দুর্নীতি ও নিপীড়ন অবসানের লড়াইয়ের ডাক দেওয়া মোল্লা ওমর মুজাহিদ ও তাঁর নেতৃত্বাধীন ছাত্ররা  প্রথমবারের মত পূর্ণাঙ্গ ইসলামি শরিয়াহ্ ব্যাবস্থা চালু করেন।  তালেবানরা ক্ষমতালোভী মিলিশিয়াদের হটিয়ে দেশটির ৯৫% এরও বেশি এলাকা ১৯৯৬ সালের মধ্যে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হন। নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলকে ইমারতে ইসলামিয়া আফগানিস্তান হিসেবে নতুন রাষ্ট্রের ঘোষণা করা হয় । ২০০১ সাল পর্যন্ত তাঁরা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। দীর্ঘ ৫ বছরেরও অধিক সময় ধরে আফগানিস্তানে ইসলামি শরিয়াহ্ ব্যবস্থার সুশীতল ছায়াতলে মানুষ ফিরে পায় শান্তি, শৃঙ্খলা আর জীবনের নিরাপত্তা।

তালেবান মুজাহিদিন কর্তৃক কাবুল বিজয় ও ইমারতে ইসলামিয়া আফগানিস্তান ঘোষণার পর হেকমতিয়ার আফগানিস্তান ছেড়ে ইরানে বসতি স্থাপন করে। আর আহমদ শাহ মাসউদ কাবুলের উত্তরে কৌশলগত পাঞ্জাশির উপত্যকায় অবস্থান নেয়। এসময় তালেবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য আবদুল রশিদ দোস্তুম, রব্বানী এবং মাসউদের নেতৃত্বে নর্দান অ্যালায়েন্স গঠিত হয়।  দেশের উত্তরে এরা শক্তি বৃদ্ধি করেছিল। সায়াফও তখন এই জোটে অন্তর্ভুক্ত হয়। এক কথায় ক্ষমতালোভী দলগুলো দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর নিজেদের মধ্যকার যুদ্ধের ইতি টানে, তা আফগান জনগণের স্বার্থ রাক্ষায় নয় বরং তালেবান মুজাহিদদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধের জন্যে।

তালেবানদের বিরুদ্ধ উত্তরাঞ্চলীয় জোট গঠনের শুরু থেকেই ইরান, রাশিয়া এবং ভারত এই জোটকে সমর্থন দিতে থাকে। এসময় তুরস্কও (বর্তমানের মতো) দোস্তুমকে  সমর্থন দেয়।

এরপর এই জোট অক্টোবরে কাবুলে তালেবানদের উপর হামলা চালায়। ফলে তালেবানরাও পাল্টা আক্রমণ করেন এবং কাবুলের উত্তরাঞ্চল এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাগরাম বিমানঘাঁটি দখল করেন। এভাবেই মুজাহিদগণ পাঞ্জাশির উপত্যকার দ্বারে পৌঁছে যান। তালেবানরা আফগানিস্তানের কেন্দ্রীয় অঞ্চলগুলো শিয়া হিজব-ই-বাহাদেতের কাছ থেকে বিজয় করার পর, এই দলটি ১৯৯৬ সালের শেষের দিকে উত্তর ছাড়া দেশের সমস্ত অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য হারায়। এভাবে ক্ষমতালোভী মিলিশিয়াগুলো ধীরে ধীরে দেশের উত্তরাঞ্চলে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

তালেবানরা আফগানিস্তানের বেশিরভাগ অঞ্চল এবং রাজধানী বিজয় করলে, পাকিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরব তালেবানকে আফগানিস্তানের নতুন সরকার হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করে। অন্য দেশগুলো তখনো উত্তরাঞ্চলীয় জোটকে দেশের সরকার হিসাবে সমর্থন করতে থাকে।

এরপর ১৯৯৮ সালে তালেবানরা কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি এবং আফগানিস্তানের নতুন সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবে বৈধ শাসক হিসেবে স্বীকৃতির জন্য বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করে। এসময় তালেবানরা জাতিসংঘে সদস্যপদের জন্যও আবেদন করেছিলেন। পরে অবশ্য তালেবানরা এই আবেদন প্রত্যাহার করে।  কারণ তারা জানতে পেরেছিল এই সদস্যপদের জন্য যেসব শর্তাবলী অন্তর্ভুক্ত তা অনৈসলামিক আইনের গ্রহণ ও প্রয়োগকে স্বীকার করে। ফলে তালেবান সরকার জাতিসংঘের সদস্যপদ ছাড়াই বহির্বিশ্ব থেকে স্বীকৃতি আদায়ের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য এবার চোখ ফেরানো যাক ১৯৮০ এর দশকে। ৮০’র দশকে আফগান যুদ্ধ শুরু হলে ফিলিস্তিনি শিক্ষাবিদ ও ‘গ্লোবাল জিহাদের’ স্বপ্নদ্রষ্টা ড. আবদুল্লাহ আজজাম (১৯৪১-১৯৮৯) এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।তিনি বিশ্বের ইসলামপন্থীদের রুশ বিরোধী আফগান যুদ্ধে নিয়ে আসতে সর্বাধিক ভূমিকা পালন করেন।

আবদুল্লাহ আজজাম রহিমাহুল্লাহ এই যুদ্ধের বিষয়ে তাঁর বিখ্যাত ফতোয়াটি জারি করেন। তিনি তাঁর দলিল ভিত্তিক ফতোয়া এবং বক্তৃতা দিয়ে অসংখ্য মানুষকে জিহাদে যোগদানের জন্য অনুপ্রাণিত করেন। বিশেষভাবে আরব বিশ্বের অনেক তরুণকে তিনি প্রভাবিত করেছিলেন।  হাজার হাজার মানুষ এই যুদ্ধে যোগ দিতে পাকিস্তান আসে এবং সেখান থেকে আফগানিস্তানে প্রবেশ করেছিল। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে আফগান যুদ্ধে বিদেশ থেকে আনুমানিক ২৫ হাজার মুজাহিদ অংশগ্রহণ করেছিলেন।

ওসামা বিন লাদেন (১৯৫৭-২০১১), আল কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা ও আমীর, আরবের একজন ধনী ও বিখ্যাত ব্যবসায়ী। আবদুল্লাহ আজজাম রহিমাহুল্লাহ’র আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি আফগান জিহাদে জড়িত হন।  এবং এই জিহাদ এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে  বিপুল পরিমাণে সাহায্য করেন। বিশেষ করে  আরবের শীর্ষ ধনীর সন্তান হবার পরেও এই যুদ্ধে তাঁর স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণ তাঁকে আরবদের মাঝে আরও বিখ্যাত করে তুলেছিল। আজজাম রহিমাহুল্লাহ তাঁর বক্তৃতায় মাঝে মাঝেই বিন লাদেনের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও মুসলিম উম্মাহর জন্য তাঁর হৃদয়ের ভালোবাসার প্রশংসা করতেন।

একইভাবে মিসরের জিহাদী গ্রুপ “তাওহীদ ওয়াল জিহাদ” এর আমীর ও মিসরের বিখ্যাত চিকিৎসক আয়মান আজ-জাওয়াহিরিও (১৯৫১-) এই যুদ্ধের সময় মুসলিমদের সাহায্যের জন্য পাকিস্তানে আসেন।  তিনি চিকিৎসক হিসেবে আফগান মুজাহিদ ও শরণার্থীদের চিকিৎসায় অংশ নেন।

একইভাজে আবু কাতাদা আল-ফিলিস্তিনি (১৯৬০-), আবু মুহাম্মদ আল-মাকদিসি (১৯৫৯-), সাইয়্যেদ ইমাম শরীফ (আব্দুল কাদির বিন আবদুল আজিজ) (১৯৫০-), আবু মুসাব আস-সুরি (১৯৫৮-) এর মতো মহান ব্যক্তিদের অনেকেই এই যুদ্ধে যোগদান বা সমর্থন করার জন্য এই অঞ্চলে আসেন। পরবর্তীতে তাঁরা ‘গ্লোবাল জিহাদ’ এর জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত হন।

দখলদার রুশ বাহিনী আফগানিস্তান ছাড়ার পর এই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বিদেশি (আরব-অনারব) মুজাহিদগণ ১৯৮৯ সাল থেকে আফগানিস্তান ছাড়তে শুরু করেন।

অনেক মুজাহিদ তাদের দেশে ফিরে যান বা একই সময়ে শুরু হওয়া যুদ্ধে অংশ নিতে বসনিয়া, চেচনিয়া, আলজেরিয়া ও তাজিকিস্তানের মতো অন্যান্য অঞ্চলে চলে যান। যাদের মাঝে ওসামা বিন লাদেনও ছিলেন। তিনি ৮০ এর দশকে আফগান যুদ্ধে আবু আবদুল্লাহ নামে বিখ্যাত হয়েছিলেন। ১৯৮৯ সালে তিনি সৌদি আরবে ফিরে আসেন।

১৯৯০-৯১ সালে উপসাগরীয় সংকট ও যুদ্ধের সময় মার্কিন সৈন্যদের সৌদি আরবে আসার তীব্র বিরোধীতা করেন শাইখ ওসামা। আমেরিকা থেকে সাহয্য নেবার পরিবর্তে তাঁর অধীনস্থ সেচ্ছাসেবক ও মুজাহিদদের এই কাজে যুক্ত করার পরামর্শ দেন সৌদি আরবকে। যাদেরকে ওসামা বিন লাদেন আফগানে গড়ে তুলেছেন, যাদের অনেকে তখনও আফগানে ও কেউ কেউ আরবে অবস্থান করছিলেন। কিন্তু সৌদি আরব ওসামার পরামর্শ গ্রহন করেনি। তারা আরবের মাটিতে ক্রুসেডার মার্কিন সৈন্যদের আশ্রয় দেয়। যার ফলে সৌদি আরব ও ওসামা বিন লাদেনের মাঝে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ফলে তিনি ১৯৯১ সালে পুনরায় আফগানিস্তানে ফিরে আসেন এবং ১৯৯২ সালে সুদানে বসতি স্থাপন করেন। আর এখান থেকে তিনি গ্লোবাল জিহাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকেন।

এদিকে ১৯৯২ সালে  আফগানিস্তান ক্ষমতালোভীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। তখন বিদেশি মুজাহিদগণ আরও দ্রুততার সাথে আফগানিস্তান ছাড়তে শুরু করেন। কারণ তাঁরা যেই স্বপ্ন বুকে নিয়ে এখানে এসেছিলেন তা নিজেদের চোখের সামনেই ক্ষমতালোভীদের হাতে ধ্বংস হচ্ছিল। তবে মিশর ও আরব মুজাহিদদের একটা অংশ তখনও আফগানিস্তানে অবস্থান করেন। এসময় এই মুজাহিদগণ নতুন এক যুদ্ধের জন্য সামরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশিক্ষণ অব্যাহত রাখেন। তবে তাঁরা ক্ষমতালোভী দলগুলোর মধ্যে চলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেন। মূলত বিদেশি মুজাহিদগণ এই প্রশিক্ষণ শিবিরে, তাঁদের নিজ নিজ দেশে এবং বিশ্বব্যাপী সামরিক সংগ্রামের একটি নতুন অধ্যায়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

এরপর ১৯৯৬ সালে মোল্লা ওমরের নেতৃত্বাধীন তালেবান মুজাহিদগণ রাজধানী কাবুল দখল করলে আরব মুজাহিদদের এই দলটি মোল্লা ওমরের সাথে সম্পর্ক তৈরিতে মনযোগী হন। অপরদিকে ওসামা বিন লাদেন ১৯৯২-১৯৯৬ সময়ে  সুদানের সাথে যৌথভাবে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন। এরইমধ্যে ১৯৯৪ সালে সৌদিআরব তাঁর নাগরিকত্ব বাতিল করে। এবং সৌদি আরবের হাতে তুলে দেবার জন্য সুদানের কাছে  দাবি জানাতে শুরু করে। ফলে সুদান বিন লাদেনের দেশ ত্যাগের জন্য চাপ সৃষ্টি করে। আর তখন ১৯৯৬ সালের মে মাসে তিনি আবারো আফগানিস্তানে আসেন। সেসময় আফগানিস্তানের ক্ষমতায় এসেছে মোল্লা ওমরের নেতৃত্বাধীন তালেবান সরকার। কিন্তু তালেবানরা তখনও উত্তরাঞ্চলীয় জোট নর্দান অ্যালায়েন্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এতে তালেবানদের অনেক ক্ষয়ক্ষতি  হতে থাকে। আর ঠিক তখনই ওসামা বিন লাদেন আফগানিস্তানে মোল্লা ওমরের নেতৃত্বাধীন তালেবানদের সমর্থন করতে আরব মুজাহিদদের পরামর্শ ও নির্দেশনা দেন। এরমধ্য দিয়ে আল কায়েদা-তালেবানদের সহযোগিতা পর্ব শুরু হয়। এবং তখন শাইখ আইমান আজ-জাওয়াহিরি হাফিজাহুল্লাহ’র নেতৃত্বাধীন মিশরের দলটিও নিজেদের দল বিলুপ্ত করে  আল-কায়েদার সাথে যুক্ত হয়ে যায় ।

বিজয়ের পদধ্বনি- ৪ || সমাজতন্ত্রের পতন ও তালেবানদের নতুন ইসলামিক সম্রাজ্যের উত্থান-৩(শেষ পর্ব)

তালেবান আল- কায়েদার মধ্যে এই সহযোগিতা পর্ব শুরু হলে তালেবানরা একে একে উত্তরাঞ্চলীয় জোটের বিরুদ্ধে সফল অভিযান চালাতে শুরু করেন। কেননা আল-কায়েদা তখন যোদ্ধা, অস্ত্র, অর্থ আর পরামর্শ দিয়ে তালেবানদের সর্বাত্মক সহায়তা করে যাচ্ছিল।

এদিকে তালেবান তাঁদের শাসনামলে ঐতিহাসিক কিছু সিদ্ধান্ত ও কাজ সম্পূর্ণ করেন। এরমধ্যে রয়েছে আফিম ও পপি চাষসহ মাদকদ্রব্য চাষাবাদের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ। ফলে ২০০০ সালে তালেবান শাসনামলে আফগানিস্তানে এসব মাদকদ্রব্য চাষাবাদ বা উৎপাদন ৯৭% হ্রাস পায়। বিশ্বের মাদক ব্যবসা একটি বড় সংকটে পড়ে যায়। একই সময়ে আফগানিস্তানের উত্তর-পূর্বে, যা রাশিয়া, ইরান ও আমেরিকার মদদপুষ্ট মাসউদ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন- সেখানে মাদক উৎপাদন অব্যাহত ছিল এবং তা মাসউদ বাহিনীর অর্থায়নে ব্যবহৃত হত।

১৯৯৯ সালের আগস্টে আফগানিস্তানের উন্নয়নের উপর কাতার ভিত্তিক সংবাদ সংস্থা আল-জাজিরা একটি সাক্ষাৎকার গ্রহন করে। এসময় সংস্থাটির কাতারের রাজধানী দোহার স্টুডিওতে হিজব-ই-ইসলামীর নেতা হেকমতিয়ারের প্রতিনিধি আব্দুল হাকিম, প্যারিস থেকে জাতিসংঘের মুখপাত্র হিসেবে লাহদার ইব্রাহিমি, লন্ডন থেকে বিখ্যাত ইসলামপন্থী সাংবাদিক তৈসির আল্লুনি উপস্থিত ছিল। তারা উক্ত অনুষ্ঠানে আফগান যুদ্ধ, ওসামা বিন লাদেনের উপস্থিতি, তালেবানদের কার্যকলাপ, কূটনৈতিক স্বীকৃতির প্রচেষ্টা এবং ঐক্যের আহ্বান নিয়ে আলোচনা করে।

এসময় তৈসির আল্লুনি আফগানিস্তান ধ্বংসের জন্য তালেবান-পূর্ব গোষ্ঠীর মধ্যকার গৃহযুদ্ধকে দোষারোপ করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে তালেবানরা দেশে স্থিতিশীলতা এনেছে। জাতিসংঘের পক্ষে কথা বলা সত্ত্বেও ইব্রাহিমিও নিশ্চিত করেছেন যে, তালেবানরা দেশে স্থিতিশীলতা এনেছে এবং জীবনযাত্রার উন্নতিতে অবদান রেখেছে। অপরদিকে হেকমতিয়ারের প্রতিনিধি আবদুল হাকিম তালেবানকে ঐক্যের আহ্বান করে এবং জোট সরকার গঠনের পরামর্শ দেয়। তখন তৈসির আল্লুনি হেকমতিয়ারকে স্মরণ করিয়ে দেন যে এটা বহুবার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু দলগুলো একটি সমঝোতায় আসতে না পেরে বরং আফগানিস্তানকে ধ্বংস করেছে। আয়োজক হেকমতিয়ারকে বলেন যে, তালেবান তাদের সব বিরোধীদের ক্ষমা করে দিয়েছে, তাই হেকমতিয়ার আফগানিস্তানে ফিরে এসে তালেবানদের সাথে তার চিন্তা ভাগাভাগি করতে পারেন। এদিকে লাহদার ইব্রাহিমি ব্যতীত অন্যান্য অংশগ্রহণকারীরা বলেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে ইসলামী প্রশাসন চায় না, ফলে আমেরিকা এই কাজে জাতিসংঘকে তাদের স্বার্থের জন্য ব্যবহার করছে।

এই অনুষ্ঠানের এক মাস পরেই অর্থাৎ অক্টোবরে ক্রুসেডার আমেরিকা জাতিসংঘে “সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন” করার ভিত্তিতে আফগানিস্তানের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিল উত্থাপন করে। কুফ্ফার জাতিসংঘের পাঁচটি স্থায়ী প্রতিনিধি, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ব্রিটেন এবং ফ্রান্স, সবাই তালেবান বিরোধী হওয়ায় আইনটি সর্বসম্মতিক্রমে এবং সহজেই পাশ হয়ে যায়। তালেবানদের নিয়ন্ত্রণাধীণ আফগান বিমান সংস্থাও নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং তালেবানদের নিকট বিমান এবং সরঞ্জাম বিক্রি নিষিদ্ধ করে জাতিসংঘ নামক কুফ্ফার সংঘটি। এই নিষেধাজ্ঞার সাথে সাথে খাদ্য সরবরাহেও সমস্যা শুরু হয়।

এরপর ২০০০ সালে ক্রুসেডার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তালেবানকে সন্ত্রাসী হিসেবে ঘোষণা করে। তালেবানদের উৎখাতের জন্য যুদ্ধরত দলগুলোর প্রতি আমেরিকা সমর্থনের ঘোষণা দেয় এবং সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, উজবেকিস্তান, রাশিয়া, ইরান এবং ভারত কর্তৃক উত্তরাঞ্চলীয় জোটের কাছে পাঠানো অস্ত্র ও অন্যান্য ধরনের আর্থিক সহায়তার ফলে তালেবানরা কিছুদিন উত্তর-পূর্ব আফগানিস্তানে প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকেন।

এছাড়াও ২০০০ সালে, চীন এবং রাশিয়া আফগানিস্তানে বোমা হামলার হুমকি দেয় এই ভিত্তিতে যে “এটি ইসলামী জিহাদের একটি ঘাঁটি যা তাদের দেশের জন্য হুমকি”।

২০০১ সালের শুরুতে, উত্তরাঞ্চলীয় জোট বিদেশী সমর্থন পেয়ে তালেবানদের উপর আক্রমণ শুরু করে। এরপর ২০০১ সালের মার্চ মাসে তালেবানরা বৌদ্ধের মূর্তি ধ্বংস করেন। এই ঘটনার পরের মাসে আফগানিস্তান, ইরান এবং উজবেকিস্তানের মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষ হয়। এবছরের মে মাসে রশিদ দোস্তাম, তুরস্ক থেকে উত্তর-পূর্ব আফগানিস্তানে ফিরে আসে এই আশায় যে, তালেবানের বিরুদ্ধে উত্তরাঞ্চলীয় জোটকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অর্থায়ন করা হবে।

১৯৯৮ থেকে শুরু করে, আহমদ শাহ মাসউদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র , রাশিয়া, ইরান এবং ভারতের তীব্র সমর্থন পায়, যা তাকে দীর্ঘদিন ধরে তালেবানদের বিরুদ্ধে টিকিয়ে রেখেছিল। মাসউদ সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বছরগুলোতে ইউরোপে সাপোর্ট নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল। এই সব দেশগুলো মাসউদ (উত্তরাঞ্চলীয় জোট) বাহিনীকে প্রচুর অর্থ এবং হেলিকপ্টারসহ ভারী অস্ত্র সরবরাহ করছিল। এই সময়কালে বুরহান উদ্দিন রব্বানীও মাসউদ বাহিনীর রাজনৈতিক শাখায় যুক্ত হয়। সবমিলিয়ে উত্তরাঞ্চলীয় জোটকে পশ্চিমা বিশ্বসহ অন্যান্য দেশগুলোও তালেবানদের বিরুদ্ধে সহায়তা করতে থাকে।

মাসউদের প্রতি বিভিন্ন দেশের তীব্র সমর্থন এসবই ছিল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মার্কিন প্রকল্পেরই অংশ। যাদের লক্ষ্য ছিল এই অঞ্চলে সরাসরি সৈন্য পাঠিয়ে এবং যুদ্ধে জড়িত হয়ে তালেবানকে উৎখাত করা। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মাসউদের সাথে বিভিন্ন চুক্তি করে। এবং বিভিন্ন সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য তার সাথে দীর্ঘ আলোচনায় লিপ্ত হয়।

২০০১ সালের এপ্রিল মাসে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বক্তৃতাকালে মাসউদ বলেছিল যে আফগানিস্তান “মৌলবাদী ইসলামপন্থীদের” দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং সমগ্র বিশ্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসময় সে আমেরিকা ও ইংল্যান্ড’কে আফগানিস্তানে হস্তক্ষেপ এবং তাদের সমর্থন করতে বলে। সেই লক্ষ্যে মাসউদ ইইউ কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা ও চুক্তি করে।

এরপর রশিদ দোস্তাম ২০০১ সালের মে মাসে আফগানিস্তানে মাসউদ বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ফিরে আসে। তখন সে বলে, ‘আমার বন্ধু বলেছে যে, সে তার বাহিনী পুনর্গঠন করতে চায় এবং তালেবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ, রাশিয়া, ইরান এবং ভারতের সহায়তায়’।

উত্তরাঞ্চলীয় জোটের এসব কর্মকান্ড তালেবানদের নিকট তাঁদের ভবিষ্যত স্পষ্ট করে দেয়। তালেবান ও আল-কায়েদা বুঝতে পারে যে, আফগানিস্তানে ক্রুসেডার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইইউ খুব শীঘ্রই আক্রমণ চালাতে যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইইউর সাথে মাসউদের সহযোগিতার সম্পর্ক ইমারতে ইসলামিয়ার জন্য অনেক বেশি বিপদজনক হবে। তাই এই জোট ও মাসউদকে শেষ করার সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন আল-কায়েদার মুজাহিদরা।

সেই লক্ষ্যে আল-কায়েদা, মাসউদকে একটি বড়িতে দীর্যদিন ধরে দু’জন ছদ্মবেশী সাংবাদিকের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণে রাখেন। এবং ৯/১১ হামলার দুমাস আগে আল-কায়েদার দুজন তিউনিশিয়ান মুজাহিদ (ছদ্মবেশী সাংবাদিক) আত্মঘাতী বোমা হামলার মাধ্যমে মাসউদ ও তার সাথীদের ঐ বাড়িতে হত্যা করেন। এরমধ্য দিয়ে ক্রুসেডাররা ইমারতে ইসলামিয়াকে ধ্বংস করার যেই পরিকল্পনা করেছিল, তা ভেস্তে দেন আল-কায়েদার মুজাহিদগণ। এরপর খুব সহজেই উত্তরাঞ্চলীয় জোটকে ধ্বংস ও তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ গ্রহন করেন তালেবান মুজাহিদগণ।

এখন ফিরে যাওয়া যাক তালিবান শাসনামলে। বিজয়ের পদধ্বনি- ৪ পর্বের শেষ অংশের পর থেকে

তালিবান ও আল-কায়েদার নেতৃত্ব বুঝতে পারলেন যে, তাদের ভবিষ্যত ইসলামি রাষ্ট্রের জন্য সবাচাইতে বড় হুমকি হচ্ছে অ্যামেরিকা ও তাদের অর্থায়নে পরিচালিত আফগানের উত্তরাঞ্চলের মিত্র জোট। অ্যামেরিকা যতদিন নিজ শক্তি ও সমর্থন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে এবং যতদিন এর মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া না হবে, ততদিন ইসলামি শাসন ব্যাবস্থা স্থায়ী হবেনা। তাদের স্বপ্নও পূর্ণ হবে না। ফলে ইমামুল মুজাহিদিন শহিদ শাইখ ওসামা বিন লাদেন রহিমাহুল্লাহ্’র নির্দেশে প্রথমেই অ্যামেরিকা ও পশ্চিমাদের অর্থায়নে পরিচালিত উত্তরাঞ্চলীয় জোটের নেতা আহমদ শাহ মাসুদকে মুজাহিদগণ হত্যা করেন এবং তাদের ঐক্য ও শক্তি ধ্বংস করে দেন। আহমদ শাহ মাসুদের হত্যা ও তাদের পরাজয় ছিল স্পষ্টত আমেরিকার গালে চপেটাঘাত, সেই সাথে ইমারতে ইসলামিয়াকে ধ্বংস করতে পশ্চিমাদের প্রথম প্ল্যান ধ্বংস করে দেওয়া। কিন্তু অ্যামেরিকা বসে থাকার মত কোন শক্তি নয়; বরং তারা ইমারতকে ধ্বংস করতে নতুন নতুন পরিকল্পনা তৈরি করতে থাকে। অ্যামেরিকার লক্ষ ছিলো আফগানিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা এবং বিশ্ব রাজনীতিতে কোনঠাসা করে রাখা। বিভিন্ন ভাবে অ্যামেরিকা আফগানিস্তানে অস্থির অবস্থা তৈরি করতে থাকে। বিশেষ ভাবে, তৎকালীন যুদ্ধবাজ গোত্রীয় নেতাদের হাতে অস্ত্র এবং ডলার তুলে দিয়ে।

এসবের মধ্যমেই ইমারতে ইসলামিয়ার তালিবান সরকার ও তাদের পরীক্ষিত বন্ধু আল-কায়েদা বুঝতে পারে যে, অ্যামেরিকার সাথে তাদের একটি সংঘর্ষ নিকট প্রায়। আল-কায়েদা ও তালিবান এটাও বুঝতে পেরেছিলেন যে, প্রচলিত কৌশলে আমেরিকার সাথে সম্মুখ যুদ্ধে টিকে থাকা কঠিন হবে। তাই তারা সিদ্ধান্ত নেন যে, অ্যামেরিকা একটি দীর্ঘ মেয়াদী গেরিলা যুদ্ধে আটকে ফেলা হবে। বিশেষ ভাবে, সোভিয়ের ইউনিয়নের সাথে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে আল কায়েদা এই রণকৌশল গ্রহন করে।

দীর্ঘদিন যাবৎ এই অ্যামেরিকা সারা দুনিয়ায় লক্ষ লক্ষ মুসলিম হত্যা করেছে। কিন্তু অ্যামেরিকা এ সকল কিছু করেছে আড়ালে থেকে। এজন্য মুসলিম উম্মাহ’র সামনে অ্যামেরিকার আসল চেহারা পরিষ্কার ছিলোনা। এমনকি অনেকে তো এমনও মনে করতেন, অ্যামেরিকা বুঝি সত্যিই মানবদরদী, বিশ্ব মানবতার প্রতীক! এই প্রতারণা থেকে উম্মাহ’কে মুক্তি দেয়ার জন্য দরকার ছিলো অ্যামেরিকার আসল চেহারা প্রকাশ করে দেয়া। একই সাথে, আরো একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার ছিলো তা হচ্ছে – অ্যামেরিকাকে সাপের মাথা হিসেবে চিহ্নিত করা। মুসলিম বিশ্বে অ্যামেরিকার মদদ পুষ্ট বিভিন্ন মুরতাদঃ সরকার সাধারণ মুসলিমদের উপরে নিপীড়ন চালিয়ে আসছিল। বিভিন্ন জিহাদি জামাত গুলো মনে করতেন, এরাই বুঝি উম্মাহ’র সবচেয়ে বড় শত্রু এবং তাদেরকেই আঘাত করতেন। কিন্তু অ্যামেরিকা বার বার তার স্বার্থ মত নতুন শাসক ক্ষমতায় নিয়ে আসতো, এতে করে উম্মাহ’র মেহনত থেকে তেমন কোন ফল প্রকাশ পাচ্ছিলোনা। এজন্যও এটি প্রকাশ করা জরুরী ছিল যে, আসল শত্রু এবুং সাপের মাথা আচ্ছে অ্যামেরিকা।

এই যুদ্ধের জন্য আল-কায়েদার প্রয়োজন ছিল  সাপের মাথা আমেরিকাকে তার নিজ সুরক্ষিত গর্ত থেকে খোলা ময়দানে বের করে আনা। অ্যামেরিকাকে এমন আঘাত করা যেন সে উদ্ভ্রান্তের মত ছুটে এসে যুদ্ধের ফাঁদে পা দেয়। তবে এই আঘাত শুধু অ্যামেরিকা’কে যুদ্ধে টেনে নিয়ে আসার জন্য নয় বরং লক্ষ লক্ষ মুসলিম হত্যার প্রতিশোধও বটে।

এই প্রেক্ষাপটে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, অ্যামেরিকার বুকে তাদেরই ভূমি থেকে তাদের হৃদপিন্ডে ৪টি বিমান হামলা চালায় আল কায়েদা যা বিশ্ববাসীর কাছে ৯/১১ হামলা নামে অধিক পরিচিত।

আল-কায়েদা, বরকতময়ী এই হামলার মাধ্যমে তাদের দূরদর্শিতা ও রণকৌশলের সক্ষমতার জানান দেয়। তাঁরা প্রমাণ করে দেন যে, রণদক্ষতায় কতটা পারদর্শী। এই হামলার ফলে অ্যামেরিকার নীতিনির্ধারক ও কৌশলবিদরা তাদের চিন্তা শক্তি হারিয়ে ফেলে। অ্যামেরিকা তখন যুদ্ধের ফলাফল চিন্তা না করে এবং দীর্ঘমেয়াদী কৌশল গ্রহণ না করেই আফগানে হামলা করে বসে। প্রথম ধাক্কায় মুজাহিদগণ কৌশল হিসেবে পিছু সরে যান, অ্যামেরিকাকে ভাবার সুযোগ দেন তারা জয়ের স্বাদ পেয়েই গেছে। এরই মাঝে সন্ত্রাসী অ্যামেরিকা আফগান থেকে নজর দেয় ইরাকের দিকে।

এবার আল কায়েদা এবং তালিবান অ্যামেরিকাকে পাল্টা আক্রমন করে বসে বিপুল বিক্রমে। বিজয়ের ভ্রান্ত স্বাদ পাওয়া অ্যামেরিকার নেশার ঘোর কাটতে বেশী সময় লাগেনি, কিন্তু ততক্ষণে তার আর কিছুই করার নেই। শুধু তাই নয়, আফগানিস্তানের সাথে সাথে ইরাকেও চলতে থাকে অ্যামেরিকার উপরে পাল্টা আক্রমন। আঘাতের পর আঘাত খেয়ে অ্যামেরিকা দিশেহারা, পাগলা কুকুরের মত হয়ে যায়! শুধু তাই নয় অ্যামেরিকাকে দুনিয়া জুড়ে বিভিন্ন ভাবে আঘাত করা হতে থাকে, অ্যামেরিকার নিরাপত্তা নষ্ট করে ফেলা হয়। অ্যামেরিকা বুঝতে পারে ঘরে কিংবা ময়দানে কোথাও সে নিরাপদ নয়। এমন ভীতিকর অবস্থায়, অহংকারে উন্মত্ত অ্যামেরিকা শুধু একটি কাজই করতে পারে তা হচ্ছে পরিত্রাণ পাবার আশায় বিলিওন বিলিওন ডলার খরচ করতেই থাকা … গলায় যে কাঁটা বেঁধে গেছে!

বিজয়ের পদধ্বনি- ৫ || আল-কায়েদা কর্তৃক ৯/১১ হামলা ও চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধের সূচনা

খিলাফতে উসমানীয়ার পতনের অর্ধশতাধিক বছর পর ৯০ এর দশকে প্রথমবারের মত তালিবান আন্দোলনের মাধ্যমে ইসলামী শরিয়াহ্ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য ব্যাপক আকারে জিহাদী কার্যক্রম শুরু হয় আফগানিস্তানে। এই জিহাদ আরব আজমের প্রতিটি মু’মিনের অন্তরকে নাড়া দিয়েছিল। উম্মাহ’র যুবকরা আবারো খিলাফাহ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং শাহাদাত লাভে ধন্য হতে আফগান জিহাদ ঘিরে স্বপ্নের জাল বুনতে শুরু করেন। এই স্বপ্ন নিয়ে আরব-আজমের মুসলিম যুবকরা জড়ো হতে থাকেন আফগানের ভূমিতে।

আফগানে হিজরত করা মুসলিমদের মধ্যে আরবদের মোটা দাগে দুই ভাগে বিভক্ত করা যায় – একদল ইয়েমেনি এবং অপর দল মিশরীয়।

সরল ধর্মীয় অনুভূতি থেকে অনেক আরব ভাই ইয়েমেনিদের ক্যাম্পে যোগ দিতেন। সর্বদা কঠোর প্রশিক্ষণ এবং সালাত, যিকির-আযকারে মশগুল থাকায় তাদের প্রশংসা করে অনেকেই “দরবেশ” বলে ডাকতেন। আশির দশকের শেষ দিকে রুশরা পর্যুদস্ত হয়ে আফগানের ভূমি ত্যাগ করতে থাকলে এই “দরবেশ” ভাইদের অনেকেই নিজ দেশে ফিরে যান। তবে অনেকে রয়ে যান এবং বিবাহবন্ধনের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে আফগানে বসবাস শুরু করেন।

অপরদিকে মিশরীয় ক্যাম্পে যারা ছিলেন, তাদের চিন্তাধারা ছিল দূরদর্শী এবং রাজনৈতিক। তাদের অনেকেই ছিলেন ইখওয়ানুল মুসলিমীন এর প্রাক্তন সদস্য। কিন্তু ইসলাম কায়েমের জন্য জিহাদকে বেছে না নেয়ায় তারা ইখওয়ানদের উপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। এই ক্যাম্পের ভাইদের অনেকেই ছিলেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এবং মিশরের সেনাবাহিনীর প্রাক্তন অফিসার। আরো ছিলেন মিশরের ডক্টর আইমান আয যাওয়াহিরির সংগঠন “জামাআতুল জিহাদ” এর সদস্যরা। তারা বাস্তবিক অভিজ্ঞতার আলোকে উপলব্ধি করেন, মুসলিম বিশ্বের সকল সর্বনাশের মূল হলো অ্যামেরিকা, আর মুসলিম নামধারী মধ্যপ্রাচ্যের আমেরিকার পদলেহী শাসকেরা। মিশরীয় ক্যাম্পের নেতৃত্ব ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে ছিলেন স্বয়ং ড. আইমান আয যাওয়াহিরি (হাফিযাহুল্লাহ)। তিনি প্রায়ই এশার সালাতের পর চলমান বৈশ্বিক সমস্যা নিয়ে সবার সাথে আলোচনা করতেন।

তালিবান মুজাহিদীনরা ১৯৯৬ এ ইসলামি ইমারত প্রতিষ্ঠা করার সময়ের মধ্যে মিশরীয় এই ক্যাম্পটি অনেক যুবকের নজর কাড়ে এবং তারা সবাই এই ক্যাম্পেই যোগ দেন। এখান থেকেই শায়েখ উসামা বিন লাদেন, শহীদ  ড. আব্দুল্লাহ আযযাম, শায়েখ আবু উবাইদাহ (রহিমাহুমুল্লাহ), ড. আইমান আয যাওয়াহিরি (হাফিযাহুল্লাহ) প্রমুখ ব্যক্তিবর্গের হাতে আল-কায়েদার জন্ম হয়। আরবি “القاعدة”  শব্দের অর্থ “ঘাঁটি”, বা ভিত্তিস্থাপন। মূলত আরব মুজাহিদীনদের ঘাঁটি থেকে দলটির সূচনা ও নতুন এক ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তিস্থাপনের স্বপ্ন নিয়ে পাথ চলা শুরু করায় এর নামকরণ করা হয় “আল-কায়েদা”।

বিজয়ের পদধ্বনি- ৬ || নতুন ক্রুসেড ও একজন মোল্লা ওমর রহিমাহুল্লাহ্

ইতিহাস অধ্যয়ন করলে দেখতে পাওয়া যায় সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্বের দীর্ঘ ইতিহাস। মিথ্যা সর্বদাই সত্যকে (ইসলাম) পরাজিত করার জন্য ভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্রের পথ খুঁজতে থাকে। তারা পার্থিব জগতে ইসলামের কেন্দ্রগুলোকে তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে চায়, তাদের ওপর ইসলামবিরোধী সংস্কৃতি প্রসার ও প্রয়োগ করতে চায়। ইসলামের কেন্দ্রগুলোতে মিথ্যা ও প্রত্যাখ্যাত ধারণা ছড়িয়ে দিতে চায়। সেই সূত্রে তারা আফগানিস্তানেও বার বার এই চেষ্টা করেছে। কিন্তু প্রতিবারই তারা সত্যের পতাকাবাহীদের কাছে লাঞ্চনাকর পরাজয়ের বরণ করেছে।

যেহেতু আফগানিস্তান এই অঞ্চল ও বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত দেশ, তাই বিশ্বের পরাশক্তিগুলো এই দেশ বার বার দখল করতে এসেও সবসময় ব্যর্থ হয়েছে। বৃটিশ বা রুশ যেই হোক না কেন, তারা এখানে নিজেদের শক্তি পরীক্ষা করতে এসে নিজেদের মাথা ও সম্পত্তি দিয়ে বড় মূল্য চুকিয়েছে। কিন্তু এখান থেকে তারা ব্যর্থতা ও অপমান ছাড়া আর কিছুই অর্জন করতে পারেনি। বিশ্ব আজও এই ভূমিতে দখলদারদের লজ্জাজনক পরাজয়ের গল্প বলছে এবং মানুষ এগুলোর উদাহরণ দিচ্ছে। কলামিস্টরা বিশ্বের পরাশক্তি আর অত্যাচারী শাসকদের এই ভূমিতে পা রাখার অনেক গল্প নথিবদ্ধ করেছে।

তবে প্রতিটি গল্পের শেষে এটাই লিপিবদ্ধ হয়েছে যে, আশ-শুহাদা ও ইসলামের এই বরকতময় ভূমি কখনোই বিদেশীদের আধিপত্য ও ক্ষমতা মেনে নেয়নি। তাই আফগান বীর মুসলিমদের বিরুদ্ধে বারে বারে শুরু হয়ছে ইতিহাসের এক একটি রক্তক্ষয়ী মহাযুদ্ধ।

কিন্তু আফগানরাও নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকেন নি, তারা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে জিহাদ করেছেন, ত্যাগ স্বীকার করেছেন। দখলদাররা একের পর এক তাঁদের শহর, গ্রাম ও বাড়িঘর ধ্বংস করেছে। কনের বিয়ে, অনুষ্ঠান এবং ধর্মীয় উৎসবগুলিতেও বোমাবর্ষণ করা হয়েছে। ফলে সর্বত্র শোক ও দারিদ্রের হাহাকার ছিল। আফগান জাতি তবুও পরাজয় মেনে নেয়নি, মাথা নত করেনি।

অপরদিকে প্রতিটি দখলদার শত্রু তাঁদের কাছে পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। এই পরাজয় কেউ কাগজে কলমে স্বীকার করেছে আবার কেউ ময়দান ছেড়েই পালিয়েছে।

৯০ দশকে যখন রুশরা (আজকের রাশিয়া) আফগানদের প্রবল প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সামনে টিকতে না পেরে পরাজিত হয়, তখন তাদের ক্ষমতা ও পরাশক্তির ভাবমূর্তি ধূলিসাৎ হয়ে যায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পনেরটি রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে যায়।

তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই বিজয়ের পর আফগানিস্তানে ইসলামী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা থাকলেও, তার পরিবর্তে এর বিরুদ্ধে সাতটি দল গঠিত হয়। প্রতিটি দল সিংহাসনে আরোহণের চেষ্টা করতে থাকে।

স্বভাবতই যখন একটি দেশে সাত রাজা থাকে, তখন তাদের মধ্যে পাপাচার ও দুর্নীতি বৃদ্ধি পায়। আর আফগানিস্তানেও তাই হয়েছিল। দেশটিতে ক্ষমতার লড়াই নিয়ে গৃহযুদ্ধ তীব্রতর হতে থাকে, সর্বত্র চেকপোস্ট বসিয়ে চলে নিষ্ঠুরতা, চুরি, ডাকাতি সহ সকল ধরনের অপরাধ।

তবে সেসময় এটি ছিল সর্বশক্তিমান আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহ যে, প্রয়াত আমিরুল-মুমিনিন মোল্লা মুহাম্মদ ওমর মুজাহিদ একটি একক সেনাবাহিনী এবং একটি একক কমান্ড গঠন করতে সক্ষম হন। মোল্লা ওমরের (রহিমাহুল্লাহ্) আগমনে ধীরে ধীরে আফগানরা সবাই এক পতাকাতলে জড়ো হলো। আফগানিস্তান বিশ্বের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠে। মুসলমানরা আফগানিস্তানে আশ্রয় নিতে থাকে।

কিন্তু বিশ্ব কুফ্ফাররা চায়নি আফগানরা শান্ত থাকুক। এখানে একটি ইসলামি রাষ্ট্র স্থায়ী হোক। যা সারা বিশ্বের জন্য একটি আদর্শ রোলমডেল হবে। তাই যখন ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার সহ ৩ টি স্থানে ৯/১১ হামলা হয়। তখন আমেরিকা কোন প্রমাণ ছাড়াই আফগানে অভিযান চালাতে এই হামলাকে বিশ্বের সামনে একটি অজুহাত হিসেবে দাড় করায়। সেই সাথে সিআইএ-এর নির্দেশে বিশ্ব মিডিয়ায় চলে নানারকম অপপ্রচার, যার মধ্যে অন্যতম ছিল নারী অধিকার।

ঐতিহাসিক ৯/১১ হামলার জন্য তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শহিদ ওসামা বিন লাদেন তাকবালুল্লাহকে দায়ী করে। সেই সাথে যারা এই বরকতময় হামলায় তাকে সহায়তা করেছেন। বিশেষ করে ইমারতে ইসলামিয়া আফগানিস্তান কে। কেননা শাইখ ওসামা বিন লাদেন রহিমাহুল্লাহ্ তখন ইমারাতে ইসলামিয়ার আশ্রয়ে আফগানিস্তানে অবস্থান করছেন।

ফলে ৭ অক্টোবর ২০০১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালানোর সময় দুনিয়ার কুফ্ফাররা আমীরুল মুমিনীনকে বলেছিল, আফগান প্রশাসন যেনো ওসামি বিন লাদেনকে আমেরিকার হাতে তুলে দেয়। নয়তো আফগানিস্তানে হামলা চালানোর হুশিয়ারি দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

অপরদিকে মোল্লা মুহাম্মদ ওমর মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ্ আমেরিকার এসব হুমকি ধামকিকে ভয় না করে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, শাইখ ওসামা বিন লাদেন রহিমাহুল্লাহ্ কে আমেরিকার হাতে তুলে না দেওয়ার।

এবিষয়ে, ২০০১ সালের অক্টোবর মাসে আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের এক মাস পূর্বে (সেপ্টেম্বর) ১২ মিনিটির একটি ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার শুনতে পায় বিশ্ব। সাক্ষাৎকারটি ছিল প্রায়াত আমীরুল মুমিনিন মোল্লা মুহাম্মদ ওমর মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ্’র।

যেখানে তিনি দৃঢ় কন্ঠে বলেছিলেন যে – আমরা ওসামাকে আমেরিকার হাতে তুলে দিবো না। কেননা এটি কেবল ওসামা বিন লাদেনের প্রশ্নই নয়। বরং এর সাথে ইসলামের প্রশ্নও জড়িত। ওসামাকে তাদের হাতে তুলে দিলে ইসলামের মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। সেই সাথে এটি আফগান ঐতিহ্যেরও পরিপন্থী।

আর আজকে যদি আমরা ওসামাকে দূরে ঠেলে দেই, তাহলে আজ যেসব মুসলিমরা তাকে পরিত্যাগ করার জন্য আমাদেরকে অনুরোধ করছে, একদিন তারাই ওসামাকে দূরে ঠেলে দেওয়ায় আমাদেরকে ঘৃণা করবে। যাইহোক, আমার কক্ষণোই ওসামাকে আমেরিকার হাতে তুলে দিবো না। আর যদি আমরা এমনটা করি, তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায় আমরা মুসলমানই না, আমাদের থেকে ইসলাম শেষ হয়ে গেছে।

এসময় তিনি আফগানিস্তানে আমেরিকার হামলার হুশিয়ারি সম্পর্কে বলেন :

আমার সামনে দু’টি ওয়াদা রয়েছে। একটি হচ্ছে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআ’লার ওয়াদা অপরটি বুশের ওয়াদা।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআ’লার ওয়াদা হল- আমার জমীন সুবিশাল, যদি তুমি আল্লাহ্ তাআ’লার পথে জিহাদ কর, তবে তুমি পৃথিবীর যেকোনো জায়গায়ই নিরাপদে বসবাস করতে পারবে। সেই সাথে যারা সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর ঈমান এনেছে এবং তাঁর নিকট নিজেকে সঁপে দিয়েছে, তাদেরকে তিনি সাহায্য করার প্রতিশ্রোতী দিয়েছেন।
অপরদিকে বুশের ওয়াদা হল- আমার নাগাত বাইরে এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে তুমি নিরাপদে থাকতে পারো।
এখন আমরা দেখবো এই দুই ওয়াদার মধ্যে কার ওয়াদা সত্য হয়।

আমীরুল মুমিনিন উক্ত সাক্ষাৎকারে আরো বলেন :

এই সংঘাতের মাধ্যমে মূলত আমেরিকা নিজের পায়ে নিজেই কুঠার মারছে। তাই তাদেরকেই এর মূল্য দিতে হবে। আমেরিকা বিশ্বব্যাপি যে সংঘাত শুরু করেছে, তা কখনোই থামবেনা। এমনকি যদি আমি, ওসামা বা অন্যরা মারা যায়।

তাই আমেরিকার উচিৎ এখনই পিছু হটা এবং নিজেদের পলিসিতে পরিবর্তন আনা।

এবিষয়ে, ২০০১ সালের অক্টোবর মাসে আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের এক মাস পূর্বে (সেপ্টেম্বর) ১২ মিনিটির একটি ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার শুনতে পায় বিশ্ব। সাক্ষাৎকারটি ছিল প্রায়াত আমীরুল মুমিনিন মোল্লা মুহাম্মদ ওমর মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ্’র।
যেখানে তিনি দৃঢ় কন্ঠে বলেছিলেন যে –
আমরা ওসামাকে আমেরিকার হাতে তুলে দিবো না। কেননা এটি কেবল ওসামা বিন লাদেনের প্রশ্নই নয়। বরং এর সাথে ইসলামের প্রশ্নও জড়িত। ওসামাকে তাদের হাতে তুলে দিলে ইসলামের মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। সেই সাথে এটি আফগান ঐতিহ্যেরও পরিপন্থী।
আর আজকে যদি আমরা ওসামাকে দূরে ঠেলে দেই, তাহলে আজ যেসব মুসলিমরা তাকে পরিত্যাগ করার জন্য আমাদেরকে অনুরোধ করছে, একদিন তারাই ওসামাকে দূরে ঠেলে দেওয়ায় আমাদেরকে ঘৃণা করবে। যাইহোক, আমার কক্ষণোই ওসামাকে আমেরিকার হাতে তুলে দিবো না। আর যদি আমরা এমনটা করি, তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায় আমরা মুসলমানই না, আমাদের থেকে ইসলাম শেষ হয়ে গেছে।
এসময় তিনি আফগানিস্তানে আমেরিকার হামলার হুশিয়ারি সম্পর্কে বলেন :
আমার সামনে দু’টি ওয়াদা রয়েছে। একটি হচ্ছে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআ’লার ওয়াদা অপরটি বুশের ওয়াদা।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআ’লার ওয়াদা হল- আমার জমীন সুবিশাল, যদি তুমি আল্লাহ্ তাআ’লার পথে জিহাদ কর, তবে তুমি পৃথিবীর যেকোনো জায়গায়ই নিরাপদে বসবাস করতে পারবে। সেই সাথে যারা সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর ঈমান এনেছে এবং তাঁর নিকট নিজেকে সঁপে দিয়েছে, তাদেরকে তিনি সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
অপরদিকে বুশের ওয়াদা হল- আমার নাগাত বাইরে এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে তুমি নিরাপদে থাকতে পারো।
এখন আমরা দেখবো এই দুই ওয়াদার মধ্যে কার ওয়াদা সত্য হয়।
আমীরুল মুমিনিন উক্ত সাক্ষাৎকারে আরো বলেন :
এই সংঘাতের মাধ্যমে মূলত আমেরিকা নিজের পায়ে নিজেই কুঠার মারছে। তাই তাদেরকেই এর মূল্য দিতে হবে। আমেরিকা বিশ্বব্যাপি যে সংঘাত শুরু করেছে, তা কখনোই থামবেনা। এমনকি যদি আমি, ওসামা বা অন্যরা মারা যায়।
তাই আমেরিকার উচিৎ এখনই পিছু হটা এবং নিজেদের পলিসিতে পরিবর্তন আনা।
ইনশাআল্লাহ্‌ চলবে…

কোন মন্তব্য নেই