সপ্তম শতকে ভারতে প্রথমে আরব বণিকদের মাধ্যমে ইসলাম প্রবেশ করে। তাদের সঙ্গে আসেন শান্তি-ভ্রাতৃত্বের ধর্ম প্রচারকেরাও। এরপর অষ্টম শতকের প্রথম দ...
সপ্তম শতকে ভারতে প্রথমে আরব বণিকদের মাধ্যমে ইসলাম প্রবেশ করে। তাদের সঙ্গে আসেন শান্তি-ভ্রাতৃত্বের ধর্ম প্রচারকেরাও। এরপর অষ্টম শতকের প্রথম দিকে প্রথম সামরিক অভিযান (৭১২) হয় সিন্ধুপ্রদেশে, নেতৃত্ব দেন তরুণ মুহম্মদ বিন কাসিম (৭১২-১৫)। আরবীয়দের সিন্ধুবিজয় ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সৃষ্টি করতে পারেনি। ইসলামও সিন্ধুদেশের সীমা অতিক্রম করে তখন ভারতীয় সার্বিক জীবনকে স্পর্শ করতে পারেনি। সিন্ধু অভিযানের প্রায় আড়াই শতক পর দশম শতকের মধ্যভাগে আফগানিস্থানের সুলাইমান পার্বত্য অঞ্চলের গজনীতে চরিত্রবান ও কর্মঠ আলপ্তগীন (৯৬২-৯৭৬) এক স্বাধীন রাজ্য স্থাপনে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সামানিদ বংশের পঞ্চম সুলতান আবদুল মালেকের ক্রীতদাস। আলপ্তগীন দক্ষতার সঙ্গে ১৪ বছর রাজত্ব করে মৃত্যুবরণ করলে তাঁর পুত্র আবু ইসহাক সিংহাসনে বসেন। কিন্তু অল্পকালের মধ্যেই তাঁর প্রয়াণ ঘটলে ৯৭৫ সালে পীরাই সিংহাসন লাভ করেন। সীমান্তবর্তী গজনী রাজ্যের ক্রমশ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে আতঙ্কিত হয়ে উত্তর-পশ্চিম ভারতে শাহী রাজবংশের পরাক্রান্তশালী রাজা জয়পাল গজনী আক্রমণ করেন, কিন্তু তাঁর এই গজনী, আক্রমণের প্রয়াস সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।১ এরপর গজনীতে পীরাই-এর শাসন অপ্রিয় হয়ে উঠলে তিনি জনগণের দ্বারা সিংহাসন চ্যুত হন।২

৯ এপ্রিল ৯৭৭ সালে আলপ্তগীনের ক্রীতদাস ও জামাতা নাসিরউদ্দিন সবুক্তগীন (৯৭৭-৯১ গজনীর সিংহাসনে বসেন এবং তুর্কি বংশ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন প্রতিভাবান ও উচ্চাকাঙক্ষী। অবশ্য তিনি সামানিদ বংশের সম্রাটদের অনুগত্য মৌখিকভাবে স্বীকার করে কার্যত সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে রাজত্ব পরিচালনা করতে লাগলেন। সিংহাসনে বসার কিছুদিন পরেই গজনী রাজ্যের শক্তি বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তিনি ভারতবর্ষের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন। গজনী রাজ্যের সীমান্তের কিছু অঞ্চল তিনি অধিকার করার প্রস্তুতি শুরু করলেন। আসলে সবুক্তগীনের সময় থেকেই তুর্কিদের ভারত অভিযানের পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছিল। এই সূত্রেই উত্তর-পশ্চিম ভারতে রাজা জয়পালের সঙ্গে সবুক্তগীনের দ্বন্দ্ব সংঘটিত হয়েছিল। রাজা জয়পাল কাশ্মীর থেকে মুলতান এবং সিরহিন্দ থেকে লামঘান (জালালাবাদ) পর্যন্ত তার রাজ্য বিস্তৃত করেছিলেন। সবুক্তগীনের ভারত অভিযানের প্রথম বাধা ছিল এই জয়পাল। পূর্বে অবশ্য রাজ্য-সীমান্তে তুর্কি আধিপত্য দুর্বল করে দেওয়ার জন্য জয়পাল নিজেই গজনী আক্রমণ করেছিলেন। এর প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ গ্রহণ করেছিলেন সবুক্তগীন। তিনি ৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে বিরাট সামরিক বাহিনী নিয়ে জয়পালের রাজ্য আক্রমণ করেন। হস্তগত হয় প্রভূত ধন-সম্পদ। এরপর সবুক্তগীন ফিরে আসেন গজনীতে। পরাজিত হয়ে জয়পাল দশলক্ষ স্বর্ণমুদ্রা ও পঞ্চাশটি হাতি উপঢৌকনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সন্ধির প্রস্তাব করেন। কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা করে জয়পাল সবুক্তগীনের দুই দূতকে বন্দী করলে প্রতিশ্রুতিভঙ্গের অভিযোগে ৯৯১ খ্রিস্টাব্দে সবুক্তগীন দ্বিতীয়বার জয়পালের রাজ্য আক্রমণ করেন। জয়পাল কালিঞ্জর, কনৌজ, আজমীর ও দিল্লির হিন্দু রাজাদের সংঘবদ্ধ করে এক বিশাল সেনাবাহিনী গঠন করেন। বীর বিক্রমে যুদ্ধ করে সবুক্তগীন বিশাল হিন্দুবাহিনীকে পরাজিত করে হামদান ও পেশোয়ারের মধ্যবর্তী অঞ্চল গজনী রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। শুধু তাই নয়, জয়পাল বাধ্য হয়ে কাবুল এবং তার নিকটবর্তী অঞ্চলসমূহও সবুক্তগীনকে ছেড়ে দেন। ফলে তুর্কিদের ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশের পথ সহজ হয়। ইতিপূর্বে আরবগণ মাকরান বা বেলুচিস্তান অঞ্চল দিয়ে সিন্ধু জয় করেন। কিন্তু তুর্কিগণই প্রথম খায়বার গিরিপথ দিয়ে ভারতে অভিযান করার একটি সুনির্দিষ্ট পথ আবিষ্কার করেন। এক্ষেত্রে সবুক্তগীনই ছিলেন নতুন পথপ্রদর্শক।
প্রজাহিতৈষী, সৎ ও প্রাজ্ঞ সুলতান হিসেবে সবুক্তগীন খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি গজনী রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করে ৯৯৭ সালে প্রয়াত হন। সবুক্তগীনের চার পুত্রের মধ্যে মাহমুদ ছিলেন জ্যেষ্ঠ ও যোগ্যতম। কিন্তু মৃত্যুর পূর্বে পিতা মাহমুদের পরিবর্তে ভ্রাতা ইসমাইলকে পরবর্তী উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যান। মাহমুদ এই ব্যবস্থা মেনে নিতে পারেননি। মাহমুদ ও ইসমাইলের মধ্যে সিংহাসন নিয়ে সংঘর্ষ বাধে। যুদ্ধে ইসমাইল পরাজিত হন। ভ্রাতাকে মাহমুদ কারারুদ্ধ করে দূরবর্তী এক দুর্গে নির্বাসিত করেন।
(১)
সবুক্তগীনের মৃত্যুর (৯৯৭) পর মাত্র ২৬ বছর বয়সে মাহমুদ (৯৯৭-১০৩০) পিতার মনোনীত উত্তরাধিকারী স্বীয় ভ্রাতা ইসমাইলকে সরিয়ে; ৯৯৭ সালে গজনীর অধিপতি হন। মাহমুদ ৯৭১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মাতা গজনীর জেলা শহর জাবুলিয়ানের জনৈক আমিরের কন্যা ছিলেন। শৈশবে অনেকে তাকে ‘মাহমুদ জাবুলি’ নামেও ডাকতেন। মাহমুদের বাল্যকাল সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে ঐতিহাসিকদের বর্ণনা অনুসারে এটা নিশ্চিত, সবুক্তগীন পুত্রকে প্রশাসন ও যুদ্ধবিদ্যা সম্পর্কে যেমন প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, তেমনি রাজনীতি বিদ্যার কলাকৌশল সম্পর্কেও প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। মাহমুদ লামঘান যুদ্ধের সময় গুরুত্বপূর্ণ পদে অবস্থান করে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। পিতা তাকে রাষ্ট্র পরিচালনায়ও দক্ষ করে তোলার লক্ষ্যে খোরাসানের গভর্নর নিয়োগ করেছিলেন।
পরবর্তী সময়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর পরই খোরাসানের রাজনৈতিক কতৃর্ক নিয়ে সামানি শাসকের সঙ্গে মাহমুদের বিরোধ দেখা যায়। ৯৯৮ সালে সামানিদদের পরাজিত করে স্বীয় আধিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত করেন মাহমুদ। অতঃপর তিনি ‘সুলতান’ উপাধি গ্রহণ করে তৎকালীন বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফা কাদির বিল্লাহর (৯৯১-১০৩১) আনুগত্য স্বীকার করে পত্র প্রেরণ করেন। খলিফা সন্তুষ্ট হয়ে তাকে ইয়ামিন-উদ-দৌলা’ (সাম্রাজ্যের দক্ষিণ হস্ত) ও ‘আমিন-উল-মিল্লাত’ (ধর্মের রক্ষক) খেতাবে ভূষিত করেন।

সুলতান মাহমুদ ছিলেন সেই যুগের শ্রেষ্ঠ বিজেতা। তাঁর উচ্চাকাঙক্ষামূলক পরিকল্পনাদি কার্যকরী করবার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন ছিল। আর এর যোগান পাওয়ার জন্যই তাকে বার বার ভারতে অভিযান করতে হয়েছে। মাহমুদের কাছে ভারতের সম্পদের আকর্ষণ চুম্বকের কাছে লোহর আকর্ষণের মতো ছিল।৩ তাছাড়া ভারতীয় রাজাগণ সন্ধিচুক্তি ভঙ্গ করে মাহমুদের আনুগত্য অস্বীকার করেন এবং তার ভারতীয় মিত্রবর্গের উপর অত্যাচার-উৎপীড়ন করেন। বিষয়টি আরও স্পষ্টায়িত করলে বলা যায় যে, রাজা জয়পালের সঙ্গে পিতার রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব মাহমুদের পররাষ্ট্রনীতিকে আগ্রাসী করে তোলে। জয়পালের মিত্রজোটকে শায়েস্তা করতে মাহমুদ ভারতবর্ষে সামরিক অভিযান প্রেরণ করতে বাধ্য হন। তাই মূলত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে মাহমুদের ভারত আক্রমণ অনিবার্য হয়ে পড়ে। ১০০০-১০২৭ সালের মধ্যে সুলতান মাহমুদ সতেরো বার ভারত অভিযান পরিচালনা করেন—
১. সুলতান মাহমুদের প্রথম সামরিক অভিযান পরিচালিত হয় ১০০০ সালে। এই অভিযানে তিনি লামঘান (জালালাবাদ) ও পেশোয়ারের মধ্যবর্তী অঞ্চল খাইবার গিরিপথে অবস্থিত ভারতের কিছু সীমান্তবর্তী দূর্গ ও শহর অধিকার করে নিজ সীমান্ত সুরক্ষিত করার ব্যবস্থা করেন।
২. সুলতান মাহমুদ দশ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে ১০০১ সালে পাঞ্জাবের শাসক জয়পালের বিরুদ্ধে পেশোয়ারে অভিযান পরিচালিত করেন। জয়পাল বার হাজার অশ্বারোহী, তিরিশ হাজার পদাতিক ও তিনশত হস্তী বাহিনী নিয়েও এই অভিযানে পরাস্ত হয়ে বন্দী হন। পরে জয়পাল মাহমুদকে আড়াই লক্ষ দিনার, ১৫০টি হাতি ও কিছু অঞ্চল ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে এক চুক্তির মাধ্যমে পুত্র পরিবারপরিজনসহ মুক্তি পান। ফলে সিন্ধুনদের পশ্চিম তীরবর্তী শহর উন্দ সুলতান মাহমুদের অধিকারে আসে। এই পরাজয়ের গ্লানি সহ্য করতে না পেরে জয়পাল আত্মহত্যা করলে পুত্র আনন্দপাল পাঞ্জাবের সিংহাসনে বসেন।
৩. ১০০১ থেকে ১০০৪ সাল পর্যন্ত সুলতান মাহমুদ পশ্চিমাঞ্চলে ব্যস্ত থাকায় ভারতবর্ষে অভিযান করতে পারেননি। কিন্তু ১০০৪-০৫ সালে মাহমুদ ঝিলাম নদীর তীরবর্তী ভীরা রাজ্যের (ভাটিয়া) রাজা বিজয় রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার অপরাধে তৃতীয় অভিযান পরিচালনা করেন। মাহমুদের বাহিনীর সঙ্গে বিজয় রায়ের সৈন্যদলের তিনদিন ধরে তুমুল যুদ্ধ চলে। চতুর্থ দিনে যুদ্ধ ময়দান হতে বিজয় রায় পলায়ন করেন। মাহমুদের বাহিনী তার পশ্চাদধাবন করলে উপয়ান্তর না দেখে বিজয় রায় ছুরিকাঘাতে আত্মহত্যা করেন। এই যুদ্ধে ভীরার দূর্গ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ফলে ভীরা ও এর পাশের অঞ্চল সুলতান মাহমুদের পদানত হয়।
৪. চতুর্থ অভিযান মুলতানের মুসলিম শাসনকর্তা সেখ আব্দুল হামিদ লোদির পৌত্র আবুল ফতেহ দাউদের বিরুদ্ধে ১০০৬ সালে পরিচালিত হয়। গজনীর সুলতানের আক্রমণকে প্রতিহত করার জন্য দাউদ আনন্দপালের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করেছিলেন। এই খবর মাহমুদকে ক্ষুব্ধ করে। তিনি দাউদকে সমুচিত শাস্তি প্রদানের জন্য সসৈন্যে মুলতানের দিকে অগ্রসর হন। পথিমধ্যে আনন্দপাল মাহমুদকে সশস্ত্র বাধা দেন। আনন্দপাল মাহমুদের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে কাশ্মীরের দিকে পলায়ন করেন। এরপর মাহমুদ পাঞ্জাবের মধ্য দিয়ে মুলতান অবরোধ করেন। সাত দিন অবরুদ্ধ থাকার পর দাউদ বার্ষিক কুড়ি হাজার দিরহাম কর প্রদানে প্রতিশ্রুত হয়ে বশ্যতা স্বীকার করেন। মাহমুদ তার অনুগত নও-মুসলিম নওয়াজ শাহের (পূর্ব নাম সুখপাল) হাতে মুলতানের শাসনভার অর্পণ করে মোঙ্গল নেতা ইলাক খানের অকস্মাৎ গজনী রাজ্য আক্রমণের সংবাদে দ্রুত স্বদেশে ফিরে যান। এই সুখপাল ছিলেন আনন্দপালেরই পুত্র। তিনি রাজনৈতিক কারণে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।
৫. সুখপাল বিপদমুক্ত ভেবে পরে ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করে মুলতানে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ধৃষ্টতার জবাব দিতে বলখের যুদ্ধের পরিসমাপ্তিতে সুলতান মাহমুদ সুখপাল বা নওয়াজ শাহের বিরুদ্ধে ১০০৭ সালে তার পঞ্চম অভিযান পরিচালনা করেন। সুখপাল পরাজিত হন। ক্ষতিপুরণ হিসেবে ৪ লক্ষ দিরহাম প্রদানে তাকে বাধ্য করা হয় এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।
৬. মাহমুদের ষষ্ঠ অভিযান পরিচালিত হয় ১০০৮ সালে আনন্দপালের বিরুদ্ধে। মাহমুদের বিরুদ্ধে আনন্দপাল উজ্জয়িনী, গোয়ালিয়র, কালিঞ্জর, কনৌজ, দিল্লি এবং আজমীরের রাজাদের একত্রিত করে একটি জোট গঠন করেন। এই জোটে যোগদান করে কাশ্মীরের খোক্কার উপজাতি গাষ্ঠীর তিরিশ হাজার দুর্ধর্ষ সাহসী বাহিনীও। দুরবর্তী প্রদেশ হতে মহিলারা তাদের স্বর্ণ বিক্রয় করে অর্থ দান করেন। এককথায় আনন্দপাল একটি বিশাল সেনাবাহিনী গঠন করতে ও জনসাধারণের সহানুভূতি আদায় করতে সক্ষম হন। উভয়পক্ষে উন্দ নামক স্থানে তুমুল যুদ্ধ হয়। খোক্কার বাহিনী প্রবল বিক্রমে মাহমুদের বাহিনীকে বেকায়দায় ফেলে। চূড়ান্ত বিজয়ের মুহূর্তে জয়পালের হাতি ভীত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন করতে থাকে। এহেন অবস্থায় আনন্দপালের সৈন্যগণ বিভ্রান্তিতে পড়ে যায়। এই সুযোগে সুলতান মাহমুদ মরিয়া হয়ে লড়াই চালিয়ে যান। আনন্দপালের সম্মিলিত বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়।
৭. সপ্তম অভিযান হল নগরকোট অভিযান। ১০০৯ সালে সুলতান মাহমুদ ভারতে অনুপ্রবেশ করে কাংড়া পাহাড়ের নগরকোট দূর্গ আক্রমণ ও অধিকার করেন। সেখানকার মন্দিরে ভূগর্ভস্থ সিন্দুক-ঘরে রক্ষিত ধনরত্নসব যুদ্ধে লুণ্ঠিত সম্পদ হিসেবে মাহমুদের হস্তগত হয়। ঐতিহাসিক ফিরিস্তার মতে, সাত লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা (দিনার), সাত শত মণ স্বর্ণ-রূপা নির্মিত তৈজসপত্র, দুই শত মণ খাঁটি সোনা, দুই হাজার মণ অপরিশোধিত রূপা ও কুড়ি মণ বিভিন্ন ধরনের মণিমুক্তা মাহমুদ করায়ত্ত করেন। যাইহোক, নগরকোট বিজয়ের ফলে ভারতের অন্যান্য রাজ্যে অভিযানের দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যায়। পাঞ্জাবের রাজাদের নৈতিক দুর্বলতা প্রকটিত হয় এই যুদ্ধে।
৮. দুর্ধর্ষ ঘোর উপজাতিদের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করে বিশ্বাসঘাতকতার জবাব দিতে সুলতান মাহমুদ পুনরায় মুলতানের শাসক আবুল ফতেহ দাউদের বিরুদ্ধে ১০১০ সালে অভিযান শুরু করেন। এটি তার অষ্টম অভিযান। এই অভিযানে আবুল ফতেহ মাহমুদের বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হন।
৯. আনন্দপালের পুত্র ত্রিলোচন পালের বিরুদ্ধে মাহমুদের নবম অভিযান পরিচালিত হয় ১০১৪ সালে। যদিও আনন্দপাল বারবার পরাজিত হয়েছিলেন, কিন্তু তিনি তার হারানো রাজ্য ফিরে পাওয়ার আশা ত্যাগ করেননি। মাহমুদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য তিনি লবণগিরি অঞ্চলে শক্তি সঞ্চয় করতে থাকেন। কিন্তু যুদ্ধের আগেই মারা যান আনন্দপাল। পিতার মৃত্যুর পর ত্রিলোচন পাল নন্দনায় রাজধানী স্থানান্তর করেন। এখানে তিনি সুসংবদ্ধ করে তোলেন তার সৈন্যবাহিনীকে। শেষ পর্যন্ত মাহমুদের অতর্কিত আক্রমণে ত্রিলোচন পাল পরাজিত হন এবং কাশ্মীরে পালিয়ে যান। মাহমুদের অধিকারে আসে শাহী বংশের শেষ সুরক্ষিত দুর্গ নন্দনা। এরপর ত্রিলোচন পাল পিতৃরাজ্যের শিবলি পাহাড়ে নিজ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করেন। বুন্দেলখন্ডের চান্দেলরাজের সাথে তার একটি চুক্তি সম্পন্ন হয়। মাহমুদ তাদের দুজনের জোট ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য রামগঙ্গার নিকটে ত্রিলোচন পালকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে পাঞ্জাবকে নিজ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন এবং এ প্রদেশের শাসনভার একজন আমিরের হাতে ন্যস্ত করেন। পরে ১০২১ সালে ত্রিলোচন পাল জনৈক গুপ্ত ঘাতকের হাতে নিহত হন। তার পুত্র ভীম পাল সিংহাসনে বসেন। ভীম পাল ১০২৬ সালে মারা গেলে হিন্দু শাহী বংশের পরিসমাপ্তি ঘটে।
১০. সুলতান মাহমুদের যুদ্ধ অভিযানের মধ্যে অন্যতম আকর্ষণীয় ঘটনা ছিল হিন্দুদের পবিত্র স্থান থানেশ্বর বিজয়, এটি দশম অভিযান। এই অভিযান পরিচালিত হয় ১০১৪ সালে। এই যুদ্ধে স্থানীয় হিন্দু রাজা বশ্যতা স্বীকার করেন এবং অসংখ্য ধন-সম্পদসহ থানেশ্বর দুর্গ সুলতান মাহমুদের হস্তগত হয়। অভিযানে শহরের প্রাচীন মন্দিরে রক্ষিত ব্রোঞ্জের বিখ্যাত চক্ৰস্বামী মৃর্তিও মাহমুদের করতলগত হয়।৭ ঘটনাটির সত্যতা সম্বন্ধে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।
১১. কাশ্মীর অভিযান সুলতান মাহমুদের একাদশ অভিযান। তিনি ১০১৫-১০১৬ সালের মধ্যে দু’বার কাশ্মীর বিজয়ের প্রচেষ্টা করেন। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও লৌহকোট দুর্গের দুর্ভেদ্যতার জন্য দু’বারই অভিযান ব্যর্থ হয়।
১২. লক্ষাধিক সৈন্য নিয়ে ১০১৮ সালে ক্ষত্রিয় আধিপত্যের প্রাণকেন্দ্র কনৌজের বিরুদ্ধে সুলতান মাহমুদের গুরুত্বপূর্ণ দ্বাদশ অভিযান পরিচালিত হয়। পথে সকল বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করে তিনি ২ ডিসেম্বর ঝিলাম নদী পার হলে বুলন্দ শহরের নৃপতি হরদত্ত বশ্যতা স্বীকার করে স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। অতঃপর সুলতান মাহমুদ মেহওয়ানের হিন্দু শাসনকর্তাকে পরাজিত করে মথুরার দিকে অগ্রসর হন। সমৃদ্ধিশালী এবং হিন্দুদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় কেন্দ্র মথুরা মুসলমানদের অধিকারে আসে। মাহমুদ বৃন্দাবনে আগমন করবার পূর্বেই তথাকার হিন্দু নগরপাল পলায়ন করে এবং এর ফলে সুলতান মথুরা এবং বৃন্দাবনে দেদার ধনসম্পদ লাভ করেন। বীরবিক্রমে সৈন্য পরিচালনা করে সুলতান ১০১৯ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে কনৌজের ফটকের সম্মুখে উপস্থিত হন। হর্ষবর্ধনের রাজধানী কনৌজ সুসমৃদ্ধ ছিল এবং এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সাতটি দুর্ভেদ্য দুর্গ ছিল। সুলতানের আবির্ভাবে ভীত-সন্ত্রস্ত প্রতিহার রাজা রাজ্যপাল বিনা শর্তে বশ্যতা স্বীকার করেন। একদিনেই তিনি সাতটি দুর্গ দখল করে বিপুল ধনরত্ন সংগ্রহ করেন। কনৌজ বিজয় সুলতান মাহমুদের শৌর্য-বীর্যের একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত এবং এর ফলে তিনি গঙ্গার পরপারে মুসলিম অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম হন। ধনসম্পত্তি অর্জনের দিক থেকে এই অভিযানের স্থান সোমনাথ বিজয়ের পরেই। কনৌজ অভিযানে সুলতান তিরিশ লক্ষ দিরহাম, পঞ্চান্ন হাজার দাস এবং ৩৫০টি হস্তী লাভ করেন।
১৩. প্রতিহার রাজ রাজ্যপাল সুলতান মাহমুদের বশ্যতা স্বীকার করাতে ভারতের রাজপুত রাজাদের মধ্যে বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে কালিঞ্জরের চান্দেলরাজ গোণ্ড ক্ষুব্ধ হলেন। গোয়ালিয়রের রাজার সঙ্গে গোণ্ডার এক চুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তির পর তাদের মিলিত বাহিনি রাজ্যপালকে আক্রমণ করে। এই আক্রমণে রাজ্যপাল নিহত হন। নৈতিক দিক থেকে বিচার করে সুলতান মাহমুদ তার মিত্র হিন্দু রাজার মৃত্যুর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য চান্দেলরাজকে ১০১৯-এ আক্রমণ করতে বাধ্য হন। চান্দেলরাজ গোণ্ডা যুদ্ধক্ষেত্র হতে পালিয়ে যান। মাহমুদ বিজয়ীর বেশে চান্দেলরাজের রাজধানীতে প্রবেশ করেন।
১৪. সুলতান মাহমুদ গোয়ালিয়রের বিরুদ্ধে ১০২১-২২ সালে তার চতুর্দশ অভিযান পরিচালনা করেন। রাজ্যপালের মৃত্যুর প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে সুলতান মাহমুদ চান্দেলরাজের মিত্র গোয়ালিয়র রাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। মুহম্মদ হাবিবের মতে, সুলতান মাহমুদ এই অভিযানে অসংখ্য ছুতার ও রাজমিস্ত্রী এবং কামার সঙ্গে নিয়ে যান; কারণ, তার উদ্দেশ্য ছিল পাঞ্জাবে একটি সুপরিকল্পিত প্রশাসনিক কাঠামো স্থাপন করা। প্রথমে সীমান্ত অঞ্চলের সোয়ত বাজাউর এবং কাফিরিস্তানের বিদ্রোহী উপজাতিদের দমন করে তিনি গোয়ালিয়রের দিকে অগ্রসর হন। গোয়ালিয়রের হিন্দু রাজ্য সুলতানের আনুগত্য স্বীকার করলে সুলতান মাহমুদ গজনীতে প্রত্যাবর্তন করেন।
১৫. গোয়ালিয়রের রাজা সুলতান মাহমুদের বশ্যতা স্বীকার করার পর তিনি পুনরায় হিন্দু রাজা নন্দার বিরুদ্ধে সৈন্যসামন্ত নিয়ে কালিঞ্জর আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেন ১০২৩-এ। এই অভিযানকালে তিনি গোণ্ডর বিখ্যাত দূর্গ অবরােধ করেন। কালিঞ্জরের রাজা তখন বার্ষিক কর প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আত্মরক্ষা করেন।
১৬. ভারতবর্ষের অভিযান সমূহের মধ্যে সবথেকে বিখ্যাত সৌরাষ্ট্রের সোমনাথ অভিযান। গুজরাটের কাথিওয়াড়ের সমুদ্র উপকূলে সোমনাথ মন্দির অবস্থিত। মন্দিরটি সমুদ্রের জলের উপর ভাসমান মনে হত। হিন্দুরা এখানে তীর্থ করতে আসত। মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী ছিল অশ্লীল চিত্র দ্বারা শোভিত। মন্দিরের পরিচর্যার জন্য কয়েক হাজার ব্রাহ্মণ পুরোহিত নিয়োজিত ছিলেন। ৫০০ দেবদাসী ও ২০০ গায়িকা দেবতার তুষ্টির জন্য সর্বদা নৃত্যগীত করত। ভারতবর্ষের নৃপতিগণ অনেকেই তাদের কুমারী কন্যাদের এ মন্দিরে সেবিকার জন্য উৎসর্গ করত। তীর্থযাত্রীদের মস্তক মুন্ডনের জন্য ৩০০ নাপিত নিযুক্ত ছিল। সমুদ্র সৈকতের বিশাল এলাকায় পাথরের নির্মিত ৫৬টি অলংকৃত স্তম্ভের উপর মন্দিরটি স্থাপিত ছিল এবং ঝুলন্ত ঝাড়বাতিতে সংলগ্ন উজ্জ্বল রত্নের আভায় সমগ্র গৃহটি আলোকিত হত। বিগ্রহটি ১৫ফুট লম্বা ছিল এবং এর ৬ফুট মাটির নীচে ও ৯ ফুট মাটির উপরে ছিল। এ মন্দিরের খরচ নির্বাহের জন্য হিন্দু রাজন্যবর্গ দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে দশ হাজার গ্রাম দান করেন। ঐতিহাসিক ফিরিস্তার মতে, ভারতীয় হিন্দুরা বিশ্বাস করে যে, মৃত্যুর পর আত্মা সোমনাথ দেবের নিকট গমন করে ও সোমনাথের ইচ্ছা অনুসারে প্রতিটি আত্মা দেহান্তর লাভ করে। সমুদ্রের জোয়ার ভাটা সম্বন্ধে হিন্দুরা মনে করত যে, ভগবান সোমনাথের উপাসনা করলে সমুদ্রে জোয়ার আসে। তারা মূল্যবান জিনিষপত্র এখানে এনে বাবা সোমনাথকে উৎসর্গ করা হত। এ মন্দিরে সোমনাথ দেব ছিলেন প্রধান বিগ্রহ এবং অপর বিগ্রহগুলো তার দ্বাররক্ষক ও দেহরক্ষী ছিলেন। এককথায় সোমনাথ মন্দিরকে ঘিরে ভারতীয় হিন্দুদের ধর্মীয় আবেগ জড়িত ছিল।
১০২৫ সালে সুলতান মাহমুদ বিশাল বাহিনীসহ সোমনাথের উদ্দেশ্যে গজনী ত্যাগ করেন। মুলতান ও রাজপুতনার দুর্গম মরুপথ (জয়সলমীর ও অনহিলওয়াড়া) অতিক্রম করে ছিল তার যাত্রাপথ। কঠিন সে পথে কোনও সাহায্য বা আশ্রয় পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না এতটুকু। তাই অনেক রকম ব্যবস্থা ও আয়োজন করে নিতে হয়েছিল অভিযানের পূর্বে। ভূদেব ছিলেন অনহিলওয়াড়ার চালুক্য বংশীয় রাজা। তিনি মাহমুদকে কোনও বাধাই দিলেন না। অনহিলওয়াড়ার কাছে মুন্ধীর নামক স্থানে প্রথম বাধা এল হিন্দুদের কাছ থেকে। সে বাধা বেশ প্রবল ও তাতে অংশ নিয়েছিল প্রায় কুড়ি হাজার সেনা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা পর্যদস্ত ও ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। কিছুদিন পর মাহমুদ আজমীরে উপস্থিত হলেন এবং সেখান থেকে সোমনাথ মন্দিরের প্রাচীরগাত্রের সম্মুখে মাহমুদ তার বাহিনী সন্নিবেশিত করলেন।
রাজপুত নৃপতিগণ সংঘবদ্ধ হয়ে মাহমুদের গতিরোধ করলেন; কিন্তু মাহমুদের বাহিনীর অদম্য সাহস, তেজস্বিতা, যুদ্ধস্পৃহা ও কৌশলের নিকট রাজপুত বাহিনী পরাজিত হল। এখানে মাহমুদ সোলাঙ্কিরাজ ভীমদেবকে পরাজিত করেন। ১০২৬-র ৬ জানুয়ারি সোমনাথ মন্দিরের দূর্গ-প্রাচীর লংঘন করে সুলতান মাহমুদের সৈন্যদল মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। হস্তগত হয় দু’কোটি স্বর্ণমুদ্রা।৮
তবে তীর্থকেন্দ্রগুলি সম্পর্কে লেখা দ্বাদশ শতকের সংস্কৃত গ্রন্থগুলি সোমনাথকে তেমন স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত করেনি।৯ আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এই যে, তৎকালীন স্থানীয় উপাদানে সুলতান মাহমুদ কর্তৃক উত্তর-পশ্চিম ভারতের মন্দিরগুলি ধ্বংসের বিবরণ প্রায় নেই বললেই চলে। সুতরাং আমরা পরবর্তীকালে মাহমুদকে যতই মন্দির ধ্বংসকারী ও নিপীড়ক বলে তুলে ধরি না কেন, সমকালীন সমাজে এই মন্দির ধ্বংসের ছাপ বেশি একটা পড়েনি। যদিও তুর্কি-ফারসি-আরবি বিবরণে সুলতান মাহমুদের সোমনাথ অভিযানকে বিশেষ কৃতিত্বের কাজ বলে বর্ণনা করা হয়েছে, সেখানে ভারতীয় উপাদানে একে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। চালুক্য রাজবংশের ইতিহাসকার এ কে মজুমদার তাই প্রশ্ন তুলেছেন হিন্দু সূত্রে মাহমুদের সোমনাথ মন্দির আক্রমণের কোনো উল্লেখ না থাকার দিকে : ‘But it is well known, Hindu sources do not give any information regarding the raids of Sultan Mahmud, so that what follows is based solely on the testimony of Muslim authors.১০ অথচ সাম্প্রদায়িক ঐতিহাসিকেরা তাঁর ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের বর্ণনায় বহু কালি খরচ করেছেন।১১
সোমনাথ মন্দিরের বিগ্রহ ধ্বংসকে উপলক্ষ্য করে পরবর্তীকালের ঐতিহাসিকগণ একটি ঘটনা উল্লেখ করেন যা ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিভ্রান্তিকর। কথিত আছে যে, প্রধান পুরোহিত মাহমুদকে অসংখ্য ধনরত্ন প্রদানের প্রতিদানে বিগ্রহটিকে অক্ষত অবস্থায় রাখবার জন্য অনুনয়-বিনয় করেন। কিন্তু মাহমুদ নাকি বলেন, তিনি বিগ্রহ বিক্রেতা অপেক্ষা ‘বিগ্রহ ধ্বংসকারী’রূপে পরিচিত হতে চান।১২ এ কথা বলে তরবারির আঘাতে লিঙ্গ-বিগ্রহটিকে ভেঙে ফেলেন। এর ফলে প্রস্তরের মধ্য হতে (পেট) অসংখ্য ধনরত্ন বের হয়ে আসে—এটি অন্ধকূপ হত্যার মতই অবিশ্বাস্য গল্প। গবেষণায় এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, সুলতান মাহমুদ ও তার মুর্তি ভাঙার গোটা কাহিনিটাই সাজানো।১৩ প্রথমত, মাহমুদ স্বহস্তে বিগ্রহ ভঙ্গ করেন এরূপ প্রমাণ পাওয়া যায় না। দূর্গ বিজিত হলে মাহমুদের সৈন্যবাহিনীও এর ধ্বংস সাধন করতে পারে। দ্বিতীয়ত, সুলতান-দরবারের বিখ্যাত ঐতিহাসিক ও প্রত্যক্ষদর্শী আলবেরুনী (৯৭৩-১০৪৮)১৪ বলেন যে, সোমনাথ-বিগ্রহের একটি খণ্ড গজনীর মসজিদের প্রবেশপথে রাখা হয়। কিন্তু এটি যে সোমনাথ মন্দির হতেই সংগ্রহ করা হয়েছিল তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তৃতীয়ত, সোমনাথের খ্যাতি সত্ত্বেও এটি ভারতবর্ষের সর্বপ্রাচীন মন্দির ছিল না। সুতরাং সোমনাথ বিগ্রহ ভাঙনে সুলতানের বিশেষ আগ্রহ থাকাটা অস্বাভাবিক। চতুর্থত, সোমনাথ-বিগ্রহটি ভাস্কর্য মূর্তি ছিল না, বরং ছিল একটি বৃহৎ অমসৃণ প্রস্তরলিঙ্গ। মুহম্মদ হাবিবের মতে, এটি ফঁপা প্রস্তরখণ্ড ছিল না, বরং এটি নিরেট আকৃতির প্রস্তরের লিঙ্গ ছিল অর্থাৎ এটি কোনো খোদিত মূর্তি ছিল না। সুতরাং এর ‘পেট’ অথবা অভ্যন্তর থেকে ধনরত্ন বের হয়ে আসার প্রশ্নই আসে না। পঞ্চমত, তের শতকের পারস্যের বিখ্যাত কবি সাদির মতে, বিগ্রহটি ছিল হাতির দাঁতের তৈরি।১৫
এভাবে সোমনাথ নিয়ে কালে কালে অতিরঞ্জন বেড়েছে এবং বেড়েছে মতপার্থক্যও। ফলে সোমনাথ বিগ্রহের আকার সম্বন্ধেও ঐক্যমত পৌছানোর সম্ভব হয়নি। কেউ বলেছেন বিগ্রহটি ‘লিঙ্গম’, আবার কেউ বলেছেন বিগ্রহটি ছিল ‘মানবাকৃতি’। মতভেদ রয়েছে মূর্তিটি নারী পুরুষ, এ নিয়েও। ‘মানবাকৃতি’ তথ্যটি থেকে আবার বহু অলীক কাহিনির জন্ম নিয়েছে। এই মূর্তির ভিতরে নাকি বিশ মণ ওজনের জহরত ছিল (তখন এক মণ বেশকিছু কিলোগ্রামের সমান ছিল)। অন্য এক বিবরণ অনুসারে, দুইশত মণ ওজনের একটি স্বর্ণের শিকল সোমনাথ মুর্তিটিকে যথাস্থানে সংরক্ষিত রেখেছিল। অপর এক বর্ণনায়, এটি ছিল একটি লোহার মূর্তি। উপরে স্থাপিত একটি চুম্বকের আকর্ষণে শূন্যে ত্রিশঙ্কু এই মূর্তিটির দর্শনে ভক্তবৃন্দের মনে এক ভয় মিশ্রিত শ্রদ্ধাভাব জাগিয়ে তুলত। শুধু তাই নয়, মন্দিরটিকে তিরিশ হাজার বছরের প্রাচীন বলেও জাহির করা হয়েছে। এভাবে নানা বিবরণের মধ্য দিয়ে সোমনাথ এক কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে।১৬ আর এমন বিচিত্রধর্মী আখ্যান হতে কোনোভাবেই কোনো সহজ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না।
১৭. সোমনাথ বিজয়ের পর স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পথে সুলতান মাহমুদের বাহিনী ভারতের জাঠদের দ্বারা উৎপীড়িত হন। তিনি গজনীতে ফিরে এসে জাঠদের শাস্তি বিধানের জন্য ১০২৭ সালে আবার ভারত অভিযান করেন। তার এই অভিযান বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। ১৪০০ নৌকার একটি নৌবহর তৈরি করে সুলতান মাহমুদ মুলতান হতে জাঠদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। প্রতিটি নৌকায় ২০জন করে তীরন্দাজ ছিল এবং অগ্নি নিক্ষেপণের জন্য সরঞ্জামও ছিল। অপরদিকে জাঠদের পক্ষে ছিল আট শত নৌকা এবং তাদের অধিকাংশ নিহত হয়। বিদ্রোহী ও বিশ্বাসঘাতক জাঠগণ সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হয় এই অভিযানে। এটি সুলতান মাহমুদের সপ্তদশ ও সর্বশেষ অভিযান।
(২)
সুলতান মাহমুদ ১০০০-১০২৭ সাল পর্যন্ত ১৭ বার ভারত অভিযান পরিচালনা করেন ও প্রত্যেক বারেই বিজয়ী হন। এই সাফল্যের রহস্য কি? তার সাফল্যের পেছনে নানাবিধ কারণ ছিল—
১. মাহমুদের অভিযানকালে উত্তর ভারত বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত ছিল। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্যবোধ ছিল না। অপরদিকে মাহমুদের বাহিনী ছিল ঐক্যবদ্ধ। তাই অল্পসংখ্যায় হয়েও তারা অধিক সংখ্যক হিন্দু সেনার উপর বিজয় লাভ করে।
২. মাহমুদের বাহিনীতে আফগান-তুর্কি-পারসিক-ভারতীয় প্রভৃতি গোষ্ঠীর সেনা থাকলেও তাদের মধ্যে কঠোর শৃঙ্খলাবোধ ছিল এবং মাহমুদের সুযোগ্য নেতৃত্ব তাদেরকে অপরাজেয় করে তুলেছিল।
৩. সুলতান মাহমুদের অতুলনীয় সামরিক দক্ষতা, দূরদর্শিতা, সেনাপতিত্ব তার বাহিনীর বিজয় লাভের সহায়ক হয়েছিল।
৪. সুলতান মাহমুদের প্রশিক্ষিত দ্রুতগামী অশ্বারোহী বাহিনীর ঝটিকা আক্রমণ ভারতীয়দের নিকট যথেষ্ট ভীতির সৃষ্টি করেছিল।
৫. মাহমুদের যুদ্ধরীতি ছিল সেযুগের তুলনায় অতি আধুনিক, আর হিন্দুগণ আধুনিক যুদ্ধ পদ্ধতি জানত না। তাছাড়া বিভিন্ন দেশ জয় করার অভিজ্ঞতা মুসলিম বাহিনীর ছিল। কিন্তু হিন্দুদের সেরকম যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ছিল না।
৬. প্রত্যেকটি সামরিক অভিযানে মাহমুদ প্রচুর ধনসম্পদ লাভ করেছেন। এ সম্পদ দিয়ে তিনি সৈন্যদের সন্তুষ্টি অর্জন করেছেন ও নতুন সৈন্য সংগ্রহের নিয়ামক হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
৭. নিজ দেশের অনুকূল পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতায় ভারতীয় হিন্দু সেনাগণ শত্রুপক্ষকে পর্যুদস্ত করতে পারেনি। বলা যায় তাদের স্বদেশ প্রেমের যথেষ্ট অভাব ছিল।
৮. মাহমুদ তাঁর সাহসী, দুর্ধর্ষ ও উদ্যমী সেনাবাহিনীকে জেহাদী আদর্শে যুদ্ধমুখী করতে চেয়েছেন। ফলে সৈন্যগণ মরিয়া হয়ে উঠেছিল জয়ের জন্য। তাদের আগ্রাসনের কাছে ভারতীয় সৈন্যরা দাঁড়াতে পারেনি। সর্বোপরি মাহমুদের দুর্দমনীয় বাহিনী দৃষ্টিভঙ্গিতে ছিল সম্পূর্ণভাবে বাস্তববাদী। তারা ছিল ভীষণ উচ্চাকাঙ্খী।
(৩)
এই সমস্ত অভিযানে সুলতান মাহমুদ ভারতের বহু শহর ও মন্দির লুণ্ঠন করে অফুরন্ত মূল্যবান সম্পদ নিজ রাজ্য গজনীতে গেছেন। নিজের বৈভব বৃদ্ধি ও নিয়মিত সেনাবাহিনী প্রতিপালনের জন্য এবং তা দিয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতিও ঘটিয়েছেন চরমভাবে। সম্পদের লোভে সুলতান মাহমুদ ইসলাম ধর্মাবলম্বী ইরানের অনেক শহরও কয়েকবার লুণ্ঠন করেন। অবশ্য ভারত হতে তিনি অনেক বেশি সম্পদ অর্জন করেছিলেন। তবে মনে রাখতে হবে যে, বিপুল ধন-সম্পদ আহরণের সুলভ সুযোগ কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে মুসলমান-হিন্দু শাসকদের মধ্যে বিন্দুমাত্র তফাৎ নেই। মাহমুদের পূর্বে মন্দিরের ধন-সম্পদ অনেক হিন্দু রাজাকেও মন্দির লুণ্ঠন ও ধ্বংসে প্ররোচণা দান করেছে। ১৫০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে লিখিত পতঞ্জলির ‘মহাভাষ্য’ এবং ৪০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে লিখিত পাণিনির ব্যাকরণ থেকে জানা যায় যে, মৌর্যরা তাদের অর্থভাণ্ডার পুরণের জন্য মূল্যবান ধাতব দেবদেবীর মূর্তি গলিয়ে ফেললে।১৭ কলহনের ‘রাজতরঙ্গিনী’ (৭ম তরঙ্গ দেখুন) থেকে জানা যায়, একাদশ শতকে কাশ্মীরের হিন্দুরাজা হর্ষ (১০৮৯-১১০১) সম্পদের লোভে বহু হিন্দু মন্দির ও দেবায়তন ধ্বংস করে বিখ্যাত হয়ে আছেন। হর্ষ তার রাজভাণ্ডার পূর্ণ করার জন্য নিজের সাম্রাজ্যের চারটি মন্দির বাদে সব মন্দির লুণ্ঠন করেন। ভীম কেশবের মন্দির বিধ্বস্ত করা দিয়ে এই প্রক্রিয়ার সূত্রপাত হয়েছিল। যখন এতেও রাজকোষ পূর্ণ হল না, হর্ষের আদেশে দেব-প্রতিমাও লুণ্ঠিত হতে লাগল। কি ভয়ংকর ভাবে সেসব লুণ্ঠন বা ধ্বংস করা হয়েছিল তার বর্ণনা পড়লে আমাদের চমকে উঠতে হয়। হর্ষের শাসনকালে ‘দেবোৎপাটননায়ক’ নামক একটি পদ সৃষ্টি করা হয়েছিল এই নির্দিষ্ট কাজ দায়িত্ব সহকারে সম্পাদনের জন্য।১৮ খ্যাতনামা ঐতিহাসিক ডি ডি কোশাম্বী তাঁর গ্রন্থে১৯ ‘রাজতরঙ্গিনী’কে উদ্ধৃত করে এসব লিখেছেন।

দ্বাদশ শতকে পারমার রাজারা গুজরাটে সম্পদের লোভে বহু জৈন মন্দির লুণ্ঠন করেন।২০ রমিলা থাপার মনে করেন যে, প্রতিটি মন্দির ধ্বংস বা বিলুপ্ত হলে জনপ্রিয়ভাবে বিশ্বাস করা হয় যে, মুসলিম ধ্বংসকারীদের জন্য তা হয়েছে। কিন্তু এ প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার যে, রাজানুগত্যে বঞ্চিত হয়ে বহু মন্দির অবলুপ্ত হয়েছে। ভারতের প্রাকৃতিক পরিবেশে যে কোনো স্থাপত্য নির্মাণকার্যের স্থায়িত্ব নির্ভর করে তার রক্ষণাবেক্ষণের উপর। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে শুধু বহু মন্দির নয়, বহু মসজিদও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।২১ তিনি দেখিয়েছেন, উনিশ শতকে বিশাখাপত্তনমের সিংহচলন মন্দিরটি ধ্বংস হয় রাজানুগত্যে বঞ্চিত হয়ে ও প্রাকৃতিক কারণে। অথচ এই মন্দির ধ্বংসের জন্য মুসলমানদের দায়ী করা হয়।২২ এমন দৃষ্টান্ত ভুরি ভুরি রয়েছে।২৩ বস্তুত সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের চেয়েও অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক কারণ শাসকদের বেশি প্ররোচিত করত। বৈদিক আর্যরা সিন্ধু উপত্যকার উন্নত সভ্যতা ধ্বংস করেছিল নিজেদের ঔপনিবেশিক স্বার্থে। রাজশক্তির বা শাসকদের ধর্মবিশ্বাস যা-ই থাক না কেন, শত্রুর জাগতিক ও ভাবাদর্শগত স্নায়ুকেন্দ্র ধ্বংস করার ক্ষেত্রে ধর্মীয় চিন্তার পরিবর্তে বাস্তব পরিস্থিতির পর্যালোচনাই তাদের প্রণোদিত করত। সুতরাং যে সমস্ত ঐতিহাসিকেরা মাহমুদের কাজের মধ্যে অবিমিশ্র পরধর্ম বিদ্বেষই আবিষ্কার করেন তাদের ভাবনা উদ্দেশ্যমূলক।
(৪)
বাগদাদের আব্বাসীয় খলিফা কাদির বিল্লাহ (৯৯১-১০৩১) সুলতান মাহমুদকে ‘ইয়ামিন-উদ দৌলা’ (সাম্রাজ্যের দক্ষিণ হস্ত) ও ‘আমিনউল-মিল্লাত (ধর্মের রক্ষক) উপাধি প্রদান করেন। সেহেতু মাহমুদ স্বাধীন সুলতান হিসেবে এই উপমহাদেশে পৌত্তলিকতা এবং বর্ণবাদ প্রথা ধ্বংস করে ইসলাম প্রচারের নিমিত্ত যুদ্ধাভিযানে প্রবৃত্ত হন বলে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ঈশ্বরীপ্রসাদ মনে করেন। তিনি বলেন, “বাগদাদের খলিফা কাদিরবিল্লাহ সুলতান মাহমুদের উপর পাক-ভারতে ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব ভার ন্যস্ত করেন। এই দায়িত্ব পালনের জন্যই মাহমুদ বার বার পাক ভারতে অভিযান চালান। তিনি এই উপমহাদেশে ইসলামের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করেন। হিন্দুদের সুবিখ্যাত নগরকোট ও সোমনাথ মন্দির এবং আরও কয়েকটি অঞ্চল তাঁর হস্তে বিধ্বস্ত হয়। কতিপয় রাজাসহ পাক-ভারতের শত শত হিন্দুকে তিনি ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেন।”২৪ সমসাময়িক ঐতিহাসিক উৎবীর মতে, ভারতকে ইসলামি রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্যই মাহমুদ সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। ভি এ স্মিথ মাহমুদকে ইসলামের অন্যতম গৌরব বলে মনে করেন।২৫ তিনি বলেছেন, ভারতের মূর্তি পূজকদের বিরুদ্ধে ‘পবিত্র যুদ্ধ’ বলতে তিনি যা বুঝতেন, তা চালিয়ে যেতে ব্ৰত গ্রহণ করেছিলেন।
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিত বিচার করলে এই অভিমত অনেকে স্বীকার করেন না। পাক-ভারত অভিযানের পেছনে সুলতান মাহমুদের ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্য ছিল না। কারণ-
১. শাসকদের পক্ষে ধর্ম প্রচার যে অপরিহার্য রাজকার্য, এ মনোভাবের পরিসমাপ্তি বহু পূর্বেই ঘটেছে, কারণ ইসলাম সম্প্রসারণ এবং ইসলাম প্রচারের প্রথম পর্যায় খলিফা দ্বিতীয় ওমর বা ওমর বিন আব্দুল আজিজ (৭১৭-২০) ও উমাইয়া খলিফা প্রথম ওয়ালিদের (৭০৫-১৫) সময়ে শেষ হয়েছে।
২. আব্বাসীয় খিলাফতের দুর্বলতার সুযোগে সামানি বংশ এবং পরবর্তীকালে গজনী রাজবংশের অভ্যুত্থান ঘটে এবং এইগুলি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ছিল। ধর্মযুদ্ধ পরিচালনার পরিবেশ গজনী রাজ্যে ছিল না—এই কথা বলিষ্ঠভাবে উল্লেখ করেন মুহম্মদ হাবিব।২৬ আব্বাসীয় খলিফা কাদির বিল্লাহ মাহমুদকে সর্বপ্রথম মুসলিম সুলতানের মর্যাদা দান করেন এবং তাকে সামন্ত রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়ে থাকে। তিনি সার্বভৌম নৃপতি ছিলেন মা। ফলে ইসলাম প্রচারের স্বাধীন ক্ষমতাও তাঁর ছিল না। ধর্ম প্রচারের ক্ষমতা ছিল একমাত্র আব্বাসীয় খলিফাদের। মুহম্মদ হাবিবের ভাষায়: “সমালোচকদের নিকট অভিযানগুলির ধর্মবহির্ভুত বৈশিষ্ট্যগুলি ভাস্বর হয়ে উঠবে, যদি তারা যুগধর্মের স্বরূপ উপলব্ধি করতে পারেন। এগুলি ধর্মযুদ্ধ ছিল না, বরং গৌরব এবং স্বর্ণের জন্য ছিল পার্থিব যুদ্ধাভিযান। এর মধ্যে ধর্মীয় উদ্দেশ্য অনুধাবন করা একেবারেই অসম্ভব।”২৭ এর প্রমাণ পাওয়া যায় গজনী সৈন্যবাহিনীর গঠনে। গজনীর সেনাবাহিনী পবিত্র ধর্মযোদ্ধাদের নিয়ে গঠিত ছিল না—যারা ধর্মের জন্য বেঁচে থাকতে বা জীবন দিতে প্রস্তুত ছিল। মাহমুদের সেনাবাহিনী গঠিত ছিল বেতনভোগী যুদ্ধবিদ্যায় শিক্ষিত সৈন্যদের নিয়ে যারা হিন্দু-মুসলমানদের সঙ্গে সমানভাবে যুদ্ধ করতে অভ্যস্ত ছিল।২৮
৪. সুলতান মাহমুদের সেনাবাহিনীতে অমুসলমান খোক্কার উপজাতি লোক ও হিন্দুদের যোগদান প্রমাণ করে যে, সুলতান কট্টরপন্থী ছিলেন না।
৫. সুলতান মাহমুদের সতেরো বার যুদ্ধাভিযানের মধ্যে কয়েকবার মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ পরিচালিত হয়। যেমন, তাঁর চতুর্থ অভিযান ১১০৬ সালে মুলতানের মুসলিম শাসক আবুল ফতেহ দাউদের বিরুদ্ধে এবং ১০১০ সালের অষ্টম অভিযানও আবুল ফতেহ দাউদের বিরুদ্ধে।
৬. মাহমুদ ভারতে কোনো স্থায়ী আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেননি। তিনি কেবল পাঞ্জাবকে তার সাম্রাজ্যভুক্ত করেন।
৭. ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করায় হিন্দুদের হত্যা করা হয়েছে এমন কোনো নজির নেই সুলতান মাহমুদের আমলে।
৮. মাহমুদের শাসনামলে অমুসলিমদের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা ছিল। বিজিত হিন্দু ও অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালনে কোনোপ্রকার বাধা ছিল না। তার ধর্মনীতি যে সহিষ্ণুতার উপর গড়ে উঠেছিল সে সম্পর্কে হেগ, এলফিনস্টোন প্রমুখ ঐতিহাসিক দ্বিমত পোষণ করেন না। বলপূর্বক ধর্মান্তরিত করা সুলতান মাহমুদের উদ্দেশ্য ছিল না।২৯ ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী ধর্মীয় ব্যাপারে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই এবং ধর্ম সম্বন্ধে বল প্রয়োগ চলে না। কয়েকজন হিন্দু রাজা স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন সম্ভবত রাজনৈতিক কারণে। সুলতান মাহমুদ গজনী ফিরে গেলে তারা পুনরায় হিন্দুধর্মে দীক্ষিত হন। ঐতিহাসিক মুহম্মদ নাজিম বলেন: “Some Hindu Rajas are said to have embracced Islam, but they did so, most probably as a political shift to escape the fury of the conqueror and returned to their faith as soon as he had turned his back on them.’ আসলে পরাজয়ের আশঙ্কায় বা ইসলামের অধীনে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ভোগের জন্য যদি হিন্দু রাজা অনুচরবর্গসহ ইসলাম ধর্মগ্রহণ করে থাকেন, তবে তা স্বতন্ত্র ব্যাপার।
৯. ক্রুসেড ও জেহাদ দ্বাদশ শতাব্দীতে সংঘটিত হয় এবং এর জন্য সালাহউদ্দিন ‘গাজী’ উপাধি লাভ করেন—কিন্তু সুলতান মাহমুদকে ‘গাজী’ পদবী প্রদান করা হয়নি। এই মতগুলো বিশ্লেষণ করলে বেশ কিছু তথ্য আমরা পেতে পারি। প্রথমেই বলা যায়, ধর্মীয় উদ্দেশ্যে প্রেরিত সামরিক অভিযানের প্রকৃতি কি ছিল? ধর্মীয় উদ্দেশ্যে প্রেরিত সামরিক অভিযানগুলো সমস্ত স্বার্থপরতা ও সাংস্কৃতিক উদ্দেশ্য থেকে মুক্ত থাকবে। পাশাপাশি এটাও মনে রাখতে হবে যে, ধর্মীয় আদর্শকে বিজয়ী করে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে ধর্মযুদ্ধ পরিচালিত হয়। সুলতান মাহমুদের সামরিক অভিযানগুলোর ধারা বিশ্লেষণ করলে উপলব্ধ হবে যে, পবিত্র কোরআনের নির্দেশমতো এগুলো ধর্মযুদ্ধ নয়। তাছাড়া মাহমুদ ইসলাম প্রচারের স্বার্থে কোন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা অবলম্বন করেননি। এমন কোন ঘটনা ঐতিহাসিকদের দ্বারা বর্ণিত হয়নি যার দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তিনি পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে হিন্দু সম্প্রদায়কে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করেন। ফলে ১০০০-১০২৭ সাল পর্যন্ত ইসলামিকরণের কোনও সার্থক প্রয়াস লক্ষ্য করা যায় না। সুলতান মাহমুদ ভারতকে নিজ সাম্রাজ্যভুক্ত করার চিন্তা করেননি, যদিও প্রত্যেক সামরিক অভিযানে তিনি বিজয়ী হন।
ধর্মপ্রাণ মাহমুদ অন্যের উপর কখনও জোর করে ধর্মের বোঝা চাপিয়ে দেননি। কেননা বিজেতা কর্তৃক অযথা হাঙ্গামা সৃষ্টি ইসলাম কখনও সমর্থন করে না। সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে মাহমুদের হিন্দু সৈন্যরাও মুসলমান সৈন্যদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করতেন। যদি তা ধর্মীয় যুদ্ধ হত, তাহলে স্বধর্মীদের উপর অস্ত্র ধারণ তাঁদের পক্ষে সম্ভব হত না। ভারতে হিন্দু রাজন্যবর্গ ও মধ্য এশিয়ার মুসলমান রাজাদের মধ্যে মাহমুদের ব্যবহারের কোনো পার্থক্য ছিল না। পারস্যে বহু মুসলমানকে তিনি হত্যা করেছিলেন এবং মধ্য এশিয়ায় প্রায় সমস্ত অভিযান তাঁর স্বধর্মীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছিল। তাই মাহমুদের দৃষ্টি যে কেবল ভারতেই নিবদ্ধ ছিল একথা বলা যায় না।
কিছু লেখক অবশ্য মন্দির ধ্বংসের জন্য সুলতান মাহমুদকে অভিযুক্ত করে থাকেন। কিন্তু তারা ভুলে যান যে, একমাত্র অভিযান বা যুদ্ধের সময়ই মন্দির ধ্বংস (মথুরা, থানেশ্বর, বৃন্দাবন, সোমনাথ) করা হয়েছিল। শান্তির সময় তিনি কখনও কোনো মন্দির ধ্বংস করেননি বা কোনো মন্দির তাঁর হস্তে অপবিত্র হয়নি।৩০ক পৌত্তলিকদের শাস্তি দেওয়ার কোনো বাসনা তার ছিল না। অবৈধ গুপ্তধনের সন্ধান না পেলে তিনি হয়তো কোনো মন্দিরের উপর আক্রমণ চালাতেন না। ওই মন্দিরগুলোতে ধর্মের নামে পুরোহিতদের দ্বারা সঞ্চিত স্বর্ণ-রৌপ্য ও অন্যান্য বহু মূল্যবান সম্পদ ছিল। আশ্বাসের ছলনায় ভুলিয়ে অসংখ্য সরল বিশ্বাসী জন সাধারণের কাছ থেকে মন্দিরের (এই) পুরোহিতেরা প্রচুর অর্থ রোজগার করছিল।৩১ তদানীন্তন সময়ে জলদস্যুরাও তাদের লুণ্ঠিত অর্থ সোমনাথ মন্দিরে গচ্ছিত রাখত। ফলে সমুদ্র তীরবর্তী ওই মন্দিরগুলোই মূলত আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হত। এছাড়া হিন্দুদের এই ধর্মীয় স্থানগুলোতে প্রবেশ করা বড় দুঃসাধ্য ছিল বলে অনেক সময় স্থানীয় রাজাগণও নিরাপত্তার জন্য এই মন্দিরগুলোর মধ্যে প্রচুর ধনরত্ন সঞ্চয় করে রাখতেন। এভাবে সোমনাথ যখন মন্দিররূপী রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল তখন তা আর আক্রমণে কোনো বাধা থাকে না। এ বিষয়ে ড. ঈশ্বরী টোপা বলেন: “মাহমুদ ভারতের যে মন্দিরগুলো আক্রমণ করেছিলেন, তাতে বিপুল ও বর্ণনাতীত ধনরত্নে পরিপূর্ণ ছিল এবং তাদের মধ্যে কয়েকটি ছিল রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপের কেন্দ্রস্থল।”৩২ সুতরাং দেবমূর্তি ভেঙ্গে ইসলাম প্রচার ও মন্দির অপবিত্র করার জন্য সুলতান মাহমুদ বারবার পাক-ভারত অভিযান করেছিলেন বলে সমালোচকগণ যে মত প্রকাশ করেছেন, ইতিহাসের বিচারে তা অসত্য। বিগ্রহে ধনরত্ন না থাকলে তা বিনষ্ট করবার কোনোই হেতু নেই এবং যদিও এর ক্ষতিসাধন করা হয় তাহলে মূর্তিপূজা উচ্ছেদের জন্য করা হয়নি, ধনরত্ন লাভের জন্যই করা হয়েছিল।
ভারতবর্ষে বহু অভিযানে সফলতা অর্জন করলেও সুলতান মাহমুদ হিন্দুদের কোনোভাবেই ইসলামে ধর্মান্তরিত করার প্রচেষ্টা চালাননি। কেননা দেখা যায়, পরাজিত বহু ভারতীয় রাজা কেবল ধন ঐশ্বর্য দিয়েই নিজেরা রক্ষা পেয়েছেন। মাহমুদ তাদের ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা তো দূরের কথা, তাদের কোনোভাবেই হয়রানি পর্যন্ত করেননি। তিনি শুধুমাত্র ধনসম্পদ নিয়েই উৎফুল্ল চিত্তে নিজের দেশে ফিরে গিয়েছেন।
মুহম্মদ হাবিব বলেন, “গজনী সৈন্যবাহিনীর অভিযানকালে যে অসংখ্য হিন্দু মন্দির ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় তা কোনো নিরপেক্ষ ঐতিহাসিক গোপন করতে এবং নিজ ধর্ম সম্বন্ধে সচেতন কোনো মুসলমান তার যথার্থতা বিচার করতে ব্যর্থ হবে।” মুহম্মদ হাবিবের এহেন ভ্রান্তিমূলক ধারণার উৎস হচ্ছে সোমনাথ বিজয়ের পাঁচশো বছর পরে লিখিত ফিরিস্তার ইতিহাস৩৩ ও ‘তারিখ-ই-আলফি’ নামক গ্রন্থ৩৪। সমসাময়িক ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় মন্দির ধ্বংসের কাহিনি বর্ণিত হয়নি। যেমন ইবনুল আসির৩৫ সোমনাথের বিগ্রহ ধ্বংসের ঘটনা উল্লেখ করেননি।৩৬
এটা ঠিক যে, মধ্যযুগীয় যুগধর্মের ছাপ মাহমুদের ভারত অভিযানে পড়েছিল। ধন-সম্পদের প্রতি তাঁর তীব্র আকর্ষণ ছিল, কিন্তু তার সদ্ব্যব্যবহার করে তিনি গজনীকে মধ্যযুগের এক শ্রেষ্ঠ শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত করেন।৩৭ এ থেকে সুলতান মাহমুদের মানবিক গুণাবলীর পরিচয় পাওয়া যায়, যা থেকে আমরা সহজে বুঝতে পারি যে, মাহমুদ ভারত অভিযানে ধর্মকে কিভাবে ব্যবহার করেছিলেন। তাই একথা পরিষ্কারভাবে বলা যায়, ভারত অভিযানে ধর্মপ্রচার তাঁর লক্ষ্য ছিল না। গজনীর হিন্দুদের প্রতি তাঁর সহিষ্ণু ও উদার ধর্মনীতিই তার পরিচয়। বহন করে। গজনীর হিন্দুদের জিজিয়া কর দিতে হত না। এইসব দিক থেকে বিচার করলে তার ভারত অভিযানের প্রকৃতিতে ধর্মের বিষয়টা গৌণ হয়ে দাঁড়ায়।৩৮
সোমনাথ মন্দির ধর্মীয় কারণেই যদি আক্রান্ত হত তাহলে ১৭ বারের মধ্যে প্রথম বারেই তা হত, ১৬ বারে তা ঘটত না। আসলে ওটা ভরা মৌচাকের মত ধনভাণ্ডার হয়ে থাকত, আর মধুলোভীর দল তা খাওয়ার জন্য বারবার ফিরে আসত। বর্তমান যুগের মত সোমনাথ মন্দির শুধু দেবতা কেন্দ্রিক হলে আক্রমণের ব্যাপার থাকত না।।
সুলতান মাহমুদ ধর্মীয় উন্মাদনা থেকেই যে ভারতে অভিযান পরিচালনা করেছেন এ তত্ত্ব প্রথম প্রচার করেন ঐতিহাসিক উৎবী তাঁর ‘তারীখ-ই-ইয়ামিনী’ গ্রন্থে৩৯। উবী ছিলেন সুলতান মাহমুদের সভা-ঐতিহাসিক। তার মতে, ধর্মীয় প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সুলতান মাহমুদ ভারত অভিযান করেছিলেন। উৎবী-র এই সরলীকৃত বক্তব্যের উপর নির্ভর করেছেন আধুনিক ঐতিহাসিকদের কেউ কেউ। কিন্তু সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করলে উত্তীর মন্তব্যের সরল অর্থ গ্রহণযোগ্য হবে না। কারণ, ভারতবর্ষে অভিযান করার পর সুলতান মাহমুদ যে ধর্ম প্রচারে মনোনিবেশ করেছিলেন বা পৃষ্ঠপোষকতা দান করেছিলেন তার কোনো সার্থক প্রমাণ নেই।
পূর্বেই বলা হয়েছে, সোমনাথ মন্দিরে বিগ্রহ ধ্বংসের যে অভিযোগ করা হয় তা বিতর্কিত। ডব্লিউ হেগের মতে, মন্দিরের অন্ধকার গর্ভগৃহ লিঙ্গ বিগ্রহ সংযুক্ত রত্নাদি হতে বিচ্ছুরিত আলোর আভায় উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। অবশ্য হাসান নিজামির ‘তাজ-উল-মাসির’৪০ উল্লেখ করে যে, ছাদ হতে ঝুলন্ত ঝাড়বাতি মূল্যবান রত্নাদিতে খচিত ছিল। পরবর্তীকালের লেখক ফিরিস্তার মতে, সুলতান মাহমুদ ফাঁপা প্রস্তর নির্মিত বিগ্রহটি বিনষ্ট করে এর অভ্যন্তরে রক্ষিত হীরা ও মণি-মাণিক্য হস্তগত করেন। মতান্তরে আলবেরুনী বলেন যে, লিঙ্গ দেবতাটি সম্পূর্ণরূপে নিরেট স্বর্ণের তৈরি ছিল।৪১ মুহম্মদ নাজিমের মতে, সুলতান মাহমুদ তার তরবারির এক আঘাতে বিগ্রহটি ধ্বংস করেন। যদিও তিনি বিগ্রহ ধ্বংস করেন তা হলেও একথা নিশ্চিত করে বলা যায় না যে, বিগ্রহে রক্ষিত রত্নাদি (ফিরিস্তা) অথবা এর গায়ে খচিত মণি-মাণিক্য (হেগ) সংগ্রহের উদ্দেশ্যেই তিনি মূর্তি ধ্বংস করেন। স্বর্ণ ব্যতীত গজনভী মুদ্রা প্রস্তুত অসম্ভব বলেই সম্ভবত এটি করা হয়। মুহম্মদ হাবিব বলেন যে, সোনা এবং রূপার তৈরি বিগ্রহ গলাইয়া গজনভী মুদ্রায় রূপান্তরিত করা হতো।৪২
(৫)
সুলতান মাহমুদের ভারত অভিযানের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই বিশেষভাবে ক্রিয়াশীল ছিল। হিন্দু রাজন্যবর্গ কর্তৃক চুক্তির শর্ত লঙঘন, সুলতানের আনুগত্য প্রত্যাহার, শত্রুকে সাহায্য দিয়ে রাজনৈতিকভাবে বিশ্বাসঘাতকতা, ভারতীয় মিত্রদের উপর শক্ত প্রতিবেশীর হামলা এবং আশ্রিত ভারতীয় রাজাদের বিদ্রোহ ঘোষণার জন্যই সুলতান মাহমুদ বার বার পাক-ভারত অভিযান পরিচালনা করতে বাধ্য হয়েছিলেন।৪৩ তবে মাহমুদ ভারত অভিযানের সূত্রপাত করেননি, পিতা সবুক্তগীন পর পর দু’বার (৯৮৬ ও ৯৮৮) শাহী রাজবংশের রাজা জয়পালের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষে যুদ্ধাভিযান করেন। মাহমুদ পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করেই জয়পালের বিরুদ্ধে ভারত অভিযান করেন। সীমান্ত অঞ্চলগুলি সুরক্ষিত করে স্বীয় রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিধানই তার অন্যতম রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। প্রয়োজনের তাগিদেই তিনি পাঞ্জাবকে নিজের সাম্রাজ্যভুক্ত করেছিলেন। ভারতের সম্পদকে তিনি যেভাবে লুণ্ঠন করেছিলেন, ঠিক তেমনভাবেই এদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিকে একেবারে পঙ্গু করে দিতেও সক্ষম হয়েছিলেন। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে বলা যায়, তিনি ভারতে কোথাও সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেননি। পাঞ্জাব ব্যতীত বিজিত হিন্দু রাজাদের কোনো রাজ্যকে তিনি তার এলাকাভুক্ত করেননি। ষষ্ঠ অভিযানে (১০০৮) আনন্দপালের বিরুদ্ধে তিনি সম্মিলিত হিন্দু বাহিনীর মোকাবিলা করেন। যুদ্ধে তিনি জয়লাভ করলেও এই বিজয়কে ভারতবর্ষের অভ্যন্তরে সুদূরপ্রসারী করবার উপযুক্ত সময় ও সুযোগ তখনও হয়নি বলে তিনি ধারণা করেন; পরবর্তীকালে মহম্মদ ঘঘারি কর্তৃক এটি সম্ভব হয়।

সোমনাথ বিগ্রহের খ্যাতি ছিল সমগ্র ভারতবর্ষব্যাপী এবং কর্মরত ব্রাহ্মণগণ মনে করত যে, বিগ্রহসমূহের অলৌকিক ক্ষমতা মাহমুদের আক্রমণ প্রতিরোধে সক্ষম। হিন্দুদের বিশ্বাস যে ভ্রান্তিমূলক ছিল, তা প্রমাণ করার জন্যই সুলতান মাহমুদ সোমনাথ জয় করতে মনস্থ করেছিলেন। ইবনে খালদুন, ফিরিস্তা, এবং ডব্লিউ হেগ প্রমুখ ঐতিহাসিকগণ এই মত সমর্থন করেন। অবশ্য সোমনাথ মন্দিরে রক্ষিত ধনরাশির সংবাদ সুলতান মাহমুদ ইতোমধ্যেই অবগত হয়েছিলেন।
তিনি হিন্দুদের উপর ইচ্ছাপূর্বক আঘাত হানেননি। যারা তাঁর অভিযানে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছেন, তাদের উপরই তিনি অস্ত্র ধারণ করেছিলেন। ঐতিহাসিক তারাচাঁদ লিখেছেন: “মাহমুদের জীবনের বিরাট আকাঙ্খ ছিল রাজ্য জয় এবং রাজ্য বিস্তারের। তিনি রাজ্য বিস্তারের কাজে নিজের গোটা জীবন অতিবাহিত করেন। এ ব্যাপারে তাঁর সফলতাও অনেক। তিনি মধ্য এশিয়া এবং পারস্যের বহু এলাকা জয় করেছিলেন …তিনি সৈনিকসুলভ সফলতা এবং বিজয়ের উদ্দেশ্যে কয়েকবার ভারত আক্রমণ করেন। হিন্দুদের প্রতারণার স্বরূপ উন্মোচনের লক্ষ্যেও কয়েকটি মন্দিরে হামলা করেছেন এবং সেগুলো জ্বালিয়ে দিয়েছেন।”
জওহরলাল নেহেরুকে তাঁর ‘গ্লিম্পসেস অফ ওয়ার্ল্ড হিস্টরি’ গ্রন্থে ভারতের ধনরত্ন লুণ্ঠন করে নিয়ে যাওয়া ছাড়া সুলতান মাহমুদকে হত্যা বা নিষ্ঠুরতার ন্যায় অপরাধের জন্য দায়ী করতে দেখা যায় না। আর ধনরত্ন লুণ্ঠন করে নিয়ে যাওয়াটা যেখানে সব সৈনিকের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। সেখানে মুসলমান বলেই শুধু মাহমুদকে সেজন্য দায়ী করা যায় না বলেও তিনি মনে করেছেন। তিনি বলেছেন: “Above everything he was a soldier. He came to India to conquer and loot, as soldiers unfortunately do, and he would have done so to whatever religion he might have belonged.’88
বস্তুতপক্ষে প্রকৃত অবস্থাও তাই। কিন্তু তা সত্বেও সুলতান মাহমুদের উক্ত অভিযানগুলির জন্যই এদেশের হিন্দু জনমনে ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি যে ঘৃণা ও বিদ্বেষের সৃষ্টি হয় তা কোনোদিনই দূরীভূত হয়নি, বরং সযত্নে লালিত হয়েছে। এটা বাস্তবিকই দুর্ভাগ্যজনক এবং তা উপলব্ধি করেই মনে হয় জওহরলাল নেহেরু তার পূর্বোক্ত ‘গ্লিম্পসেস অফ ওয়ার্ল্ড হিস্টরি’ গ্রন্থে বলেছেন: ‘You must remember that the contest was not between the Indo-Aryan civilization and the highly civilized Arabs. The contest was between civilized but decadent India and the semi-civilized and occasionally nomadic people from Central Asia, who had themselves recently been converted to Islam. Unhappily India connected Islam with this lack of civilization and with the horrors of Mahmud’s raids and bitterness grew.৪৫
এ প্রসঙ্গে নীরদ সি চৌধুরীও বলেন: “The initial hatred noted by Alberuni, with which the Hindu began his life of political subjection, went on swelling in volume during the whole period of Muslim rule. There is no fear of its atrophy from any lack of external expression. The passivity which the Hindu mode of life and the Hindu outlook generate, makes the Hindu more or less independent of action in his emotional satisfaction. On the other hand, being incapable of action, he considers it all the more his duty, to nurse his hatred in secret and take care of it as a priceless hairloom from his free ancestors. This Hindu nationalism during Muslim rule flourished on a plane where neither the military nor the political power of the conqueror could attack it.’৪৬
(৬)
সুলতান মাহমুদের সোমনাথ অভিযান নিয়ে কোনো মধ্যে মতভেদ নেই। কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত যে ঘটনাবলি, সেগুলিকে আমরা চতুরতার সঙ্গে অবহেলা করি, এড়িয়ে যায়, গুরুত্ব দিই না এবং শুধুমাত্র সোমনাথ মন্দির ভাঙার উপরেই সমস্ত আলোচনা কেন্দ্রীভূত করে থাকি। ফলে পরিণতি যা হবার তাই হচ্ছে। বলা হয় যে, মাহমুদ দেবমূর্তি ধ্বংস করার জন্য সোমনাথ মন্দির আক্রমণ করেছিল। স্মর্তব্য যে, সোমনাথ মন্দির আক্রমণের আগে মুলতান শহরের উপর আক্রমণ চালায় মাহমুদ। সেখানে ছিল মুসলিম বাদশাহর শাসন। মাহমুদ ওই বাদশাহকে পরাজিত করে সারা মুলতান শহরকে তছনছ করে দেন, এবং সেখানে একটিও মসজিদ আস্ত ছিল না।৪৭ কলহন রচিত ‘রাজতরঙ্গিনী’তেও এর বর্ণনা পাওয়া যায়। তাহলে মাহমুদ মসজিদ কেন ভাঙল, সেখানে তো মূর্তি পূজা হয় না? কেন মুলতানকে ধ্বংস করল, সেখানে তো হিন্দু শাসন নেই? এই সমস্ত প্রশ্নকে আমাদের বিচার বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে।
মাহমুদের যে সেনাবাহিনী সোমনাথ মন্দির ধ্বংস করেছিল তাঁর ৫০ শতাংশ ছিল হিন্দু। ১২জন সেনাধ্যক্ষ ছিল হিন্দু, এর মধ্যে ২জন ব্রাহ্মণ।৪৮ এদের মধ্যে তিলক রায় নামে একজন সেনাপতির নাম পাওয়া যায়। এরা সকলে সোমনাথ মন্দির আক্রমণে নিয়োজিত ছিল। এরা যেমন মুলতান আক্রমণ করে মসজিদ ধ্বংসে হাজির ছিল, তেমনি সোমনাথ মন্দির ধ্বংসেও অংশ নিয়েছিল। মাহমুদের এই বিশাল হিন্দুবাহিনী মধ্য এশিয়ায় অন্যান্য বহু যুদ্ধক্ষেত্রেও লড়াই করেছে।৪৯ ১০০৩ সালে আফগানিস্তানের সিস্তানে একটি বিদ্রোহ দেখা দিলে মাহমুদ সেখানকার মুসলমান ও খ্রীষ্টানদের নির্বিচারে হত্যার জন্য ‘পৌত্তলিক ভারতীয় বাহিনী’ ব্যবহার করেছিলেন।৫০ ঐতিহাসিক এস এ এ রিজভিও লিখেছেন : “তার (মাহমুদের) বহুজাতিক সৈন্যদলে হিন্দুদের গ্রহণ করতে কোনো দ্বিধা ছিল না মামুদের। এইসব হিন্দু সৈনিক তাদের নিজস্ব সেনাপতির অধীনে থাকত। বলা হত এমন সেনাপতিদের ‘সালার-ই হিন্দুয়াঁ’। অজ্ঞাতনামা লেখক রচিত সিস্তানের ইতিহাসে এমন অভিযোগ দেখা যায় যে মুসলিম ও খ্রিস্টানদের নৃশংসভাবে দলে দলে হত্যা করেছে মামুদের বিধর্মী ও পৌত্তলিক ভারতীয় সৈন্যদল।”৫১
শুধু তাই নয়, মাহমুদ তাঁর হিন্দু সেনাপতি তিলকের হাত দিয়ে দমন করিয়ে ছিলেন নিজেরই মুসলমান প্রধান সেনাপতি নিয়ালতিগিনের বিদ্রোহ।৫২ এসব তথ্য কখনও জানানো হয় না। জানানো হয় না মাহমুদ যেমন পঞ্চাশ হাজার অমুসলিমকে হত্যা করেন তেমনি সমান সংখ্যক মুসলিম বিদ্রোহীকেও হত্যা করেছেন।৫৩ একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হল, একটি মসজিদে মুসলিম বিদ্রোহীদের ঢালাওভাবে হত্যা করার জন্য মাহমুদ তার হিন্দু সেনাদের ব্যবহার করেছিলেন।৫৪
মাহমুদ যদি পৌত্তলিকতাবিরোধী হতেন তাহলে আফগানিস্তানের বামিয়ান বুদ্ধমূর্তি অক্ষত রাখলেন কী করে? ১৪০০ বছর ধরে মুসলিম শাসকরা যা করেনি, তা করেছে আফগানিস্তানের তালিবান শাসকরা। ওরা বুদ্ধমূর্তি ধ্বংস করেছে, মাহমুদ করেনি। সেই সঙ্গে আরও লক্ষ্যণীয় বিষয় হল, মুলতান থেকে সোমনাথ মন্দির আসার পথে আরও বহু হিন্দু মন্দির ছিল, একটাকেও মাহমুদ স্পর্শ করেনি। কোনো ঐতিহাসিক বলতে পারবেন না যে, আসার পথে মাহমুদ ওগুলিকে ধ্বংস করে এসেছেন। তিনি যদি বিগ্রহভঙ্গকারী হিসেবে চিহ্নিত হতে চাইতেন তা হলে উত্তর এবং পূর্ব ভারতের অসংখ্য দেবমন্দিরও ধ্বংস করে ফেলতেন। ১০১৯ খ্রিস্টাব্দে চান্দেল রাজ্য জয় করলেও এই রাজ্যে অবস্থিত ১০০২ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত বিখ্যাত খাজুরাহো মন্দির অক্ষত অবস্থায় থাকে। ফলে সিদ্ধান্ত করতে পারি যে, দেবমূর্তি ধ্বংস সোমনাথ আক্রমণের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল না। এরপর মাহমুদ যখন সোমনাথ থেকে চলে গেলেন তখন সে মন্দিরের দায়িত্ব কার হাতে দিয়ে গেলেন? কোনো মুসলিম গভর্ণরের হাতে নয়, দায়িত্ব দিয়ে গেলেন সেই রাজার ভায়ের হাতে যাকে পরাস্ত করে মাহমুদ মন্দির আক্রমণ করেছিলেন। সিদ্ধান্তও দিয়ে গেলেন যে, তিনি তৎক্ষণাৎ আবার সেখানে মন্দির বানাবেন।৫৫ মাহমুদের উদ্দেশ্য যদি হত হিন্দু দেবতার মূর্তি ধ্বংস করা তবে কেন সে মন্দিরের দায়িত্ব হিন্দুর হাতে দেবেন? যদি তাঁর মতলব থাকত মূর্তিপূজা বন্ধ করা, তবে সে নিশ্চয় কোনো গোঁড়া মুসলিমকে দায়িত্ব দিয়ে আসতে পারত যাতে কোনোদিন আর সোমনাথ মন্দির গড়ে উঠতে না পারে। মন্দিরের উপর হামলার বিষয়ে এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূত্র, একে অবহেলা করা যায় না। সাধারণ মানুষ এই সব তথ্য জানে না, ফলে এক শ্রেণির ছিদ্রান্বেষীরা সহজেই তাদের বিভ্রান্ত করছে। এরা স্বভাব-সিদ্ধভাবেই চেপে রাখতে চায় সত্য ইতিহাস।

একটু আগেই বলা হয়েছে, সোমনাথ মন্দির লুণ্ঠন ও ধ্বংস শুধুমাত্র মাহমুদ ও তাঁর হানাদার বাহিনীর হাতে ঘটেনি, এই বর্বরোচিত কাজে হিন্দুরাও সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল। আর এই ইতিহাস আর এস এস-এর ‘গডফাদার’ এম এস গোলওয়াকরও সত্য বলে মেনে নিয়েছেন। তার ভাষায়: “…ইট ওয়াজ দ্য হিন্দু ব্লাড অফ আওয়ার ব্লাড, ফ্লেশ অফ আওয়ার ফ্রেশ, সোল অফ আওয়ার সোল, হু স্টুড ইন দ্য ভ্যানগার্ড অফ মামুদস আর্মি। দিজ আর ফ্যাক্টস অফ হিস্ট্রি…।” আর এস এস-এর ইংরেজি মুখপত্র ‘অগানাইজার’-এ প্রকাশিত নিবন্ধে৫৬ গোলওয়াকর স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন: “এক হাজার বছর আগে আমাদেরই দেশের লোক বিদেশী অভিযানকে আমন্ত্রণ ও স্বাগত জানিয়েছিলেন।…সোমনাথ মন্দিরের অগাধ ঐশ্বর্যের কথা শুনে সুলতান মাহমুদ খাইবার পাশ অতিক্রম করে ভারতের মাটিতে পা রাখেন। …দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে দিতে একটা সময় মাহমুদ আর তাঁর সৈন্য সামন্তরা নিদারুণ কষ্টে পড়ে। এক কণা খাদ্য বা এক ফোঁটা জল আর মজুত ছিল না।…কিন্তু ওই বিদেশি হানাদারদের জীবন রক্ষা করতে এগিয়ে এলেন হিন্দু ভূস্বামীরা। সুচতুর মাহমুদ তাদের বোঝালেন যে, সৌরাষ্ট্রের আধিপত্যকামী শাসকগোষ্ঠী খুব শীঘ্রই রাজস্থান দখল করে নেবে। সুতরাং এ সময়ে মাহমুদকে সহায়তা করলে আখেরে তাদের লাভ হবে। অনভিজ্ঞ ভূস্বামীরা মাহমুদের ফাঁদে পা দিলেন ও পরবর্তী সময়ে সোমনাথ লুণ্ঠনে মুসলিম হানাদারদের সাকরেদ হয়ে উঠলেন…।”
একইভাবে চেপে যাওয়া হয় পুরীর জগন্নাথ মন্দির সম্পর্কে বিবেকানন্দের উক্তি। স্বামী বিবেকানন্দের মতে, জগন্নাথ মন্দির একসময়ে প্রাচীন বৌদ্ধমন্দির ছিল। …আমরা হিন্দুরা তা দখল করেছি।…উই শ্যাল হ্যাভ টু ডু মেনি থিঙ্কস লাইক দ্যাট ইয়েট’।৫৭ এ ব্যাপারে রুশ ইতিহাসবিদদের গবেষণা অথাৎ পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে হিন্দু ব্রাহ্মণদের সঙ্গে যিশুখ্রিষ্টের সাক্ষাৎ হয়েছিল, তা এককথায় খারিজ করে দিয়ে স্বামী বিবেকানন্দ জোরের সঙ্গেই জানিয়েছেন যে, হিন্দু ব্রাহ্মণ নয়, বৌদ্ধ লামারাই পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের দায়িত্বে ছিলেন।৫৮
আবার এটাও কৌতূহলোদ্দীপক যে, লাহোরের টাঁকশালে মুদ্রিত মাহমুদের মুদ্রাগুলিতে দেখা যায়, একপিঠে আরবি লিপিতে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মহম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’, অন্য পিঠে সংস্কৃত লিপিতে ও নাগরী লিপিতে ‘অব্যক্তম একম মহম্মদ অবতার’ লেখা বিষয়টি নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। কিছু মুদ্রায় আবার হিন্দু প্রতীক ষাড়ের চিত্রও পাওয়া গিয়েছে। রমিলা থাপার সোমনাথ থেকে পাওয়া পঞ্চদশ শতকের আরও একখানি সংস্কৃত লিপির উল্লেখ করেন, যেটি অদ্ভুতভাবে শুরু হয়েছে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ (অনন্ত করুণাময়, পরম দয়ালু আল্লাহর নামে আরম্ভ করছি’) দিয়ে। এটি উৎসর্গ করা হয় সোমনাথের এক মুসলিম অধিবাসী, বোহরা মুহাম্মদের পুত্র জনৈক বোহরা ফরিদকে। লিপিতে বলা হয়, সোমনাথ যখন তুর্কিদের দ্বারা আক্রান্ত হয়, তখন ইনি নগর রক্ষায় অংশগ্রহণ করেন এবং স্থানীয় রাজা ব্রহ্মদেবের হয়ে তুর্কিদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। এই লড়াইয়ে বোহরা ফরিদ নিহত হন। লিপিটি বোধহয় সে-কারণে তারই স্মৃতিতে উৎসর্গীকৃত হয়েছিল।৫৯
তাছাড়া সুলতান মাহমুদ ব্রাহ্মণ বা হিন্দুদের রাষ্ট্রের বহু দায়িত্বশীল পদে নিয়োগ করেছিলেন। ‘তারিখ-ই-বায়হাকি’তে বলা হয়েছে যে, সুলতান মাহমুদের সেনাপতিদের মধ্যে তিলক রায়, সোন্দি, সোনাই, হিন্দা ও হাজারী রায় ছিলেন হিন্দু।৬০ সুলতান মাহমুদের শাসনাধীনে হিন্দুগণ পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতেন। তিনি গজনীতে হিন্দুদের বসবাসের জন্য স্বতন্ত্র বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তাঁরা সেখানে নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান প্রতিপালন করতে পারতেন, কোনো বাধা বিপত্তি ছিল না। তিনি হিন্দুদের বিচার হিন্দু আইনমত করবার ব্যবস্থা মেনে চলতেন।৬১ ধর্মান্ধ হলে এই সমস্ত কাজ কি তাঁর দ্বারা সম্ভব হতো? মাহমুদের ধর্মীয় নীতি সম্পর্কে ঐতিহাসিক ডব্লিউ হেইগ ‘কেমব্রিজ হিস্টরি অফ ইন্ডিয়া’ (৩য় খণ্ড) গ্রন্থে যথার্থই বলেছেন: ‘His religious policy was based on tolerance and though zealous for Islam, he maintained a large body of Hindu troops and there is no reason to believe that conversion was a condition of their services.৬২ এদিক থেকে বিচার করলে, সুলতান মাহমুদকেই প্রথম ধর্মনিরপেক্ষ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বলা যায়। এ সি রায় তাই বলেছেন, ‘খিলাফৎ’-এর পতনের পর তিনিই সর্বপ্রথম উপলব্ধি করেছিলেন যে, ইসলাম জগতে ঐক্য ও শান্তি বজায় রাখবার একটিমাত্র উপায় হল ‘ধর্মনিরপেক্ষ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা।৬৩
(৭)
রমিলা থাপার বলেন, সোমনাথ অভিযানের ঘটনাটি একাধিক সূত্রে উল্লেখিত হয়েছে আর বহু ক্ষেত্রেই উল্লেখিত তথ্যসমূহ পরস্পর বিরোধী। তিনি বলেন, মাহমুদের সোমনাথ আক্রমণ ও মন্দির লুণ্ঠনকে দেখার এই পদ্ধতিই হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কিত ঘটনার ভুল-পাঠ। কালে কালে এটাকে যেভাবে দেখা হয়েছে তার বহু পদ্ধতি দেখার জন্য তিনি বিভিন্ন বিবরণের দিকে দৃষ্টি ফেলেছেন।৬৪ রমিলা থাপারের ‘দ্য সোমনাথ—দ্য মেনি ভয়েসেস অফ এ হিস্টরি’ গ্রন্থে৬৫ মাহমুদের ভারত অভিযানের বহু অজানা দিক উন্মোচিত হয়েছে। সোমনাথ মন্দির আক্রমণের পিছনে ৫টি ভিন্ন বর্ণনা রয়েছে সংস্কৃত সূত্রের বর্ণনা, জৈন সূত্রের বর্ণনা, তুর্কি সূত্রের বর্ণনা, ফারসি সূত্রের বর্ণনা, ব্রিটিশ সূত্রের বর্ণনা।
তীর্থস্থল হিসেবে সোমনাথের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় মহাভারতে।৬৬ বহুকাল পর্যন্ত সেখানে কোনো মন্দির ছিল না। বস্তুত সোমনাথের শৈব মন্দির নবম শতকের শেষাশেষি কিংবা দশম শতকের গোড়ার দিকের।৬৭ সোমনাথ তখন একটি সমৃদ্ধ বন্দর—আরব ও ইরান নিয়ে এক রমরমা বাণিজ্যকেন্দ্র।৬৮ তীর্থযাত্রীদের থেকে মন্দিরে যে আয় হত, তার একটা বড় অংশ পশ্চিম এশীয় বাণিজ্যে বিনিয়োগ করা হত। রমিলা থাপার বলেন, মাহমুদের আগমনের অনেক আগে থেকেই চুড়সম, অভির ও যাদব প্রভৃতির মতো কিছু স্থানীয় হিন্দু রাজা সোমনাথ তীর্থযাত্রীদের উপর নিয়মিত হামলা করতেন। আর মন্দিরে দান করার ইচ্ছায় সাধারণ মানুষ যে সব টাকাকড়ি ও দামী দ্রব্যসামগ্রী নিয়ে যেত, তা লুঠ করে নিতেন।৬৯ অন্য কথায়, ধন-প্রাচুর্যের জনশুতি শুনে সোমনাথের প্রতি যেসব হানাদার আকৃষ্ট হয়, সুলতান মাহমুদ নিশ্চয়ই তাদের প্রথম ছিলেন না।
এই সময়ের জৈন বিবরণ থেকে অন্য একটি ছবি ফুটে উঠে। মাহমুদের সমসাময়িক ধনপাল তাঁর ‘Satyauriya Mahavira Utasha’-য় লেখেন, মাহমুদ জৈন মন্দিরের মহাবীর মূর্তি ধ্বংস করতে পারেননি। ধনপাল এটি চির প্রতিদ্বন্দ্বী শৈব ধর্মের উপর জৈন ধর্মের ‘উন্নততর শক্তি’র প্রমাণ হিসেবে দেখেন। বারো শতকের প্রথম দিকের ‘Dyayashraya Kavya’ গ্রন্থের জৈন গ্রন্থাকার হেমাচন্দ্র লেখেন, রাক্ষস দৈত্য ও অসুরদের (অপদেবতা) মন্দির ধ্বংসে গুজরাটের হিন্দু চালুক্য রাজা ভীষণ ক্রুদ্ধ হন এবং তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালান।৭০ আশ্চর্য এই যে, তিনি এসব ধ্বংসকারীকে মুসলিম কিংবা তুর্কি বলে চিহ্নিত করেননি। তিনি বলেন, চালুক্যরাজ সোমনাথ তীর্থ দর্শনে যান আর মন্দিরটিকে অবহেলিত ও দুর্দশাগ্রস্থ অবস্থায় দেখতে পান। আর স্পষ্টত অনুভব করেন, ‘এটা লজ্জার কথা যে, স্থানীয় (হিন্দু) রাজারা তীর্থযাত্রীদের উপর লুঠতরাজ চালাচ্ছে।’ আরও মজার কথা, এই চালুক্যরাজই ক্যাম্বেতে একটি মসজিদ নির্মাণেরও আদেশ দেন। পরবর্তীকালে এটি মালওয়ারের হিন্দু রাজা পারমারদের আক্রমণে চুর্ণ-বিচূর্ণ হয়।৭১ বোধহয় রাজনীতির খেলায় উপাসনাস্থলগুলিকে দেখা হত ‘ক্ষমতার অভিব্যক্তি হিসেবে’, (যার দরুণ) ধর্ম-সম্পর্ক নির্বিশেষে সেগুলি হয়ে উঠে আক্রমণের লক্ষ্য। রমিলা থাপার লেখেন, ‘যখনই কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ক্ষমতা বা রাজশক্তির প্রতিভাস রূপে পরিগণিত হয়েছে তখন তার উপর আক্রমণের সম্ভবনাও দেখা দিয়েছে।’৭২
সোমনাথ মন্দির ছিল সম্পদের ভাণ্ডার। এইজন্য গুজরাটের চালুক্য রাজারা লুঠপাট থেকে একে রক্ষা করার জন্য কড়া ব্যবস্থা নেন। বারো শতকের এক উৎকীর্ণ লিপিতে বলা হচ্ছে, চালুক্যরাজ কুমারপালা ‘স্থানীয় রাজাদের দস্যুপনা ও লুঠতরাজ থেকে’ মন্দিরকে রক্ষা করার জন্য একজন গভর্নর নিযুক্ত করেন। পরবর্তী শতকের অন্য এক লিপিতে চালুক্য রাজারা চিত্রিত হন মালওয়ারের হিন্দু রাজাদের লুঠপাট থেকে মন্দিরস্থলের রক্ষাকারীরূপে। ১১৬৯-এর প্রভাসপতন লিপিতে, সোমনাথ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত হিসেবে জনৈক ভব বৃহস্পতির নিযুক্তির কথা বলা হয়—যিনি মন্দির সংস্কারে চালুক্যরাজ কুমারপালাকে উৎসাহিত করেন। কেননা এর ‘কাঠামোটি ছিল পুরাতন’। বিস্ময়ের ব্যাপার, এই লিপিতে মাহমুদের মন্দিরাক্রমণের (১০২৬) কোনো উল্লেখ নেই। এটা সম্ভবত এই কারণে যে, সে-সময়ে মন্দির লুণ্ঠন সাধারণ ঘটনাই ছিল। মাহমুদের আক্রমণের অনেক আগে থেকেই তা ছিল একটি পৌনঃপুনিক ব্যাপার।
রমিলা থাপার বিশ্বস্ততার সঙ্গে যে ঐতিহাসিক তথ্য-প্রমাণ নথিবদ্ধ করেন তাতে এই গবেষণা নাকচ হয়ে যায় যে, মাহমুদ প্রচণ্ড ধর্মোন্মত্ততা নিয়ে সোমনাথ আক্রমণ করেন, আর তা হিন্দু-মুসলমানের অন্তহীন বিরুদ্ধতার বীজ বপন করে। তিনি ১২৬৪-এর সংস্কৃতে লেখা একখানি দীর্ঘ বৈধ দলিলের (লিপি) দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেন, যাতে রয়েছে ইরানের হরমুজ থেকে আগত মুসলিম ব্যবসায়ী জনৈক খাজা নুরুদ্দিন ফিরোজের কথা। তিনি মসজিদ বানাবার জন্য সোমনাথের উপান্তে বড় এক খণ্ড জমি পান।৭৩ আর এতে স্থানীয় দুটি সংস্থার অনুমোদনও পাওয়া যায়। প্রথম সংস্থার নাম পঞ্চকুল—স্থানীয় পুরোহিত, সরকারি কর্মচারী এবং ব্যবসায়ীসহ হিন্দু সম্রান্তদের নিয়ে গঠিত। এর নেতৃত্বে ছিলেন সোমনাথ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত জনৈক বীরভদ্রভব বৃহস্পতিরই আত্মীয়। অন্য সংস্থাটি ছিল জামাথ, গঠিত হয়। হরমুজের ইরানী ব্যবসায়ী ও স্থানীয় কিছু মুসলিমকে নিয়ে। মজার ব্যাপার, মসজিদ তৈরির জন্য যে জমি দেওয়া হয়, তা ছিল সোমনাথ মন্দিরের বৃহৎ এস্টেটেরই অংশ। যদি হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে শত্রুতা থাকত তবে সেখানে মসজিদ তৈরির জন্য কিভাবে জায়গা দেওয়া হল? রমিলা থাপার লেখেন, ‘লিপির নৈতিক মনোভাব ও ভাবানুভূতি প্রশংসনীয়। তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেন, মাহমুদের আক্রমণকে তথাকথিত ইসলামী বর্বরতার নজির হিসাবে দেখা হয়নি। সঙ্গত কারণে রমিলা থাপার প্রশ্ন তুলেছেন: “পুরোহিতবর্গ ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মানসে দু’শতবৎসর পূর্বের মহমুদের আক্রমণ ও তজ্জনিত বিপর্যয়ের স্মৃতি কি এই সম্পত্তি হস্তান্তরের ঘটনায় সংঘাতের সৃষ্টি করে না? স্মৃতি কি এতই স্বল্পস্থায়ী, নাকি আক্রমণের ঘটনাটিই ছিল অপেক্ষাকৃত গুরুত্বহীন?”৭৪
(৮)
প্রকৃত ঘটনা যদি এই হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, হিন্দুত্ব প্রচারে—এমনকী ভারতীয় সাধারণ স্কুল পাঠ্যে মাহমুদের সোমনাথ আক্রমণ কী করে অন্তহীন হিন্দু-মুসলমান বিরোধিতার আদি প্রতীক হয়ে ওঠে? অথবা প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কে এম মুনশির ভাষায়, মাহমুদের মন্দির বিনাশ সহস্রাধিক বছরব্যাপী সমগ্র জাতির (হিন্দু) অবচেতনায় এক জ্বলন্ত ক্ষত, এক অবিস্মরণীয় রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়।৭৫ মাহমুদের ‘সোমনাথ আক্রমণ প্রসূত হিন্দু মর্মযন্ত্রণা’ সম্বন্ধে প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ১৮৪৩-এ, ব্রিটিশ হাউস অফ কমনসের বিতর্কে। এক বছর আগে লর্ড এলেনবরো তাঁর বিতর্কিত ফটক ঘোষণা জারী করেছিলেন। এই ঘোষণায় তিনি আফগানিস্থানের ব্রিটিশ সৈন্যকে মাহমুদের রাজধানী গজনী হয়ে ফিরতে বলেন। আর তাঁর সমাধি থেকে চন্দন কাঠের ফটক সঙ্গে করে আনার নির্দেশ দেন। লর্ড এলেনবরোর দাবি, মাহমুদ আসলে ওই ফটক লুঠ করেন সোমনাথ থেকে। পাঠানদের সঙ্গে তাঁদের যুদ্ধ প্রদর্শনী তেমন আহামারি গোছের না হলেও, তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে, এটা হবে আফগানিস্থানের উপর ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণের প্রতীক। সেই সঙ্গে হিন্দুদের হত-বিবর্ণ অহঙ্কার উপশমেও এ কাজ দেবে। হাউস অফ কমনসে ১৮৪৩-এর ‘মাহমুদ-ফটক’ বিতর্ক বাদানুবাদের ঝড় তোলে। হিন্দু তোষণের জন্য, কিংবা মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিন্দুদের লেলিয়ে দেওয়ার জন্য লর্ড এলেনবরো অভিযুক্ত হন। এমনকী এও নির্দেশ করা হয় যে, মাহমুদের আক্রমণ সংক্রান্ত বহু বিবরণের কোনোটিতেই কোনো ঐতিহাসিক এ ধরনের ফটকের কথা উল্লেখ করেননি। ওই ফটকের গল্পটি বড়জোর হতে পারে লোক-ঐতিহ্যের নব আবিষ্কার। অবশ্য লর্ড এলেনবরোর সমর্থকরা শেষ পর্যন্ত জয়ী হওয়ার ব্যবস্থা করেন এই যুক্তিতে যে, ভারতে ফটক আনা হলে ‘হিন্দু মন থেকে গ্লানি দূর হবে’। কেননা বস্তুত ‘যে চরম ধ্বংসাত্মক আক্রমণ হিন্দুস্থানকে ক্রমাগত প্রায় মরুভূমিতে পরিণত করে তোলে তার বেদনাদায়ক স্মৃতি হিসেবে হিন্দু মানস ওই ফটক স্মৃতিকে ধরে রেখেছিল। অযোধ্যার বাবরি মসজিদের ক্ষেত্রের মতো আমরা এখানেও স্পষ্ট দেখতে পাই, মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিন্দুদের লেলিয়ে দিয়ে ঔপনিবেশিক শাসনকে জোরদার করার জন্য ব্রিটিশ প্রশাসকরা তাদের নিজস্ব বানোয়াটি ইতিহাস-কথা’কে সত্য গল্প করে তুলছে।
অবশ্য ফটক নিয়ে ব্রিটিশরা যে বাদানুবাদ তোলে, তার পরিণতি ছিল বিচিত্র। ব্রিটিশ সেনারা গজনীর সুলতান মাহমুদের সমাধি থেকে এক প্রস্থ ফটক উপড়ে ফেলে আর সগৌরবে ফিরিয়ে আনে ভারতে। আনার পর অবশ্য জানা যায় যে, কাঠের ওই ফটকগুলি ভারতীয় কারিগরির নয়, বরং সেগুলি ছিল মিশরীয়—কোনোক্রমেই সোমনাথের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। অতএব এগুলি রাখা হয় আগ্রার লালকেল্লার এক অন্ধকার কুঠরীর গুদাম ঘরে।
ব্রিটিশ বর্ণনা হতে আমাদের সচেতন হতে হবে। কেননা, ব্রিটিশ বর্ণনা আমাদের হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে লড়াই বাধিয়ে দেবার জন্য পরিকল্পিতভাবে রচিত। আর সব ছেড়ে দিয়ে চলুন আগ্রা দূর্গে। ওখানে একটা কাঁচের চেম্বারে একটা দরজা রাখা আছে এবং তার বাইরে লেখা আছে—এই দরজা সুলতান মাহমুদ সোমনাথ মন্দির থেকে উপড়ে নিয়ে গিয়েছিল। আবার একটি প্লেটও ওখানে লাগানো আছে, যাতে ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একটি নোট লেখা—এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ; ওই নোট অবশ্য পড়তে হবে। পর্যটকরা সাধারণভাবে দরজার উপরে লেখা নোটটিকে গুরুত্ব দেয় না; ফলে ধারণা তৈরী হয় যে, এই দরজাটি সোমনাথ মন্দির থেকে লুঠ করা হয়েছিল। ওই নোটটিতে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ লিখেছে, এই দরজা কোনোমতেই সোমনাথের হতে পারে না; ব্রিটিশরা গল্প ছড়িয়েছে যে, সুলতান মাহমুদ সোমনাথ থেকে লুঠ করে এই দরজা আফগানিস্তানের কোথাও নিয়ে গিয়েছিল এবং সেটাকে সর্দার প্যাটেল তুলে এনে আগ্রায় বসিয়েছেন। ব্রিটিশ সংবাদপত্রগুলিও এ বিষয়ে ব্যাপক প্রচার করেছে। কিন্তু কেন এই বিভ্রান্তি সৃষ্টি? কি উদ্দেশ্যে? যতদিন ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এ বিষয়ে আলোচনা হয়নি, এবং ব্রিটিশ পত্র-পত্রিকাগুলি যতদিন না তাদের রিপোর্ট ব্যাপক হারে ছড়িয়েছে এবং সেই রিপোর্টকে উদ্ধৃত করে যতদিন না ভারতের পত্রপত্রিকাগুলো প্রচার করেছে ততদিন পর্যন্ত অর্থাৎ ১৮৪৮ সালের পূর্ব পর্যন্ত ভারতবর্ষের সোমনাথ মন্দির কোনো আলোচ্য বিষয় হিসাবেই ছিল না। ব্রিটিশ বর্ণনা প্রচারের পরই লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে যে, সুলতান মাহমুদ সোমনাথ মন্দির ভেঙ্গেছিল। সেই কারণে ব্রিটিশ সূত্রের বর্ণনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটা আসলে সম্পূর্ণরূপেই হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক।৭৬ ব্রিটিশ এটা করেছিল হিন্দু ও মুসলিম দুই সম্প্রদায়কে পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দিতে।
সোমনাথ মন্দিরের দরজাগুলি খাঁটি চন্দন কাঠের ছিল বলে অভিযোগ করা হয়। কিন্তু বর্তমানে গবেষণায় দেখা গেছে সেই অভিযুক্ত চন্দন কাঠের দরজাগুলো ছিল দেবদারু গাছের। এই তত্ত্বের প্রমাণ জে ফাগুসনের লেখা A History of Indian and Eastern Architechture গ্রন্থে রয়েছে।৭৭
সুলতান মাহমুদের ভারতবর্ষ অভিযানকালে অসংখ্য হিন্দু নির্যাতিত হয় বলে ঐতিহাসিকগণ অভিযোগ করেন। যেমন, সোমনাথ বিজয়ের সময় ৫০০০ হিন্দু প্রাণত্যাগ করে। সুলতান মাহমুদ অযথা রক্তপাত ও নৃশংস অত্যাচার করেননি একথা বলা যেতে পারে। যুক্তিস্বরূপ বলা যায় যে, তিনি তার যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ দিগ্বিজয়ী বীর ছিলেন এবং যুদ্ধাভিযান মাত্রেই রক্তপাত হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে আলেকজাণ্ডার, সীজার ও নেপোলিয়নের যুদ্ধাভিযানকালেও শত্রুপক্ষীয় অসংখ্য লোক নিহত হয়; সুতরাং যুদ্ধরীতি অনুযায়ী সুলতান মাহমুদও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। দ্বিতীয়ত, তিনি নিরীহ জনসাধারণকে হত্যা করেননি, যেভাবে নাদির শাহ আক্রোশবশে মাত্র নয় ঘন্টায় স্বধর্মীয় ৩০,০০০ দিল্লিবাসীর হত্যাকাণ্ড লালকেল্লায় বসে অবলোকন করেন। রাজ্যের স্থায়িত্ব-নিরাপত্তার জন্য এবং কখনও কখনও বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য সুলতান মাহমুদ হিন্দু এবং মুসলিম শত্রুদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেন এবং এক্ষেত্রে কখনই অহেতুক রক্তপাত করেননি। তৃতীয়ত, ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে অস্বীকার করায় হিন্দুদের হত্যা করা হয়েছে এরূপ কোনো নজির নেই। বরং নগরকোট, মথুরা ও বৃন্দাবনের সামন্ত রাজপুত নৃপতিগণ মাহমুদের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে বিনা বাধায় নগর ফটক উন্মোচিত করে দেন এবং এর ফলে বিনা রক্তপাতে এইসব অঞ্চলে সুলতান মাহমুদ অভিযান পরিচালনা করেন। এলফিনস্টোন তার ‘A History of India’ গ্রন্থে (লন্ডন, ১৯১৬) যথার্থই বলেন, “এইরকম ঘটনা কোথাও দেখা যায়নি যে, যুদ্ধ ব্যতীত কোনো হিন্দুকে কোথাও তিনি প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন।”
সুলতান মাহমুদের যে সমর প্রতিভা ছিল তার তুলনা সমগ্র বিশ্বের ইতিহাসেই বিরল। মুহম্মদ হাবিবের মতে, আলেকজান্ডারের প্রাচ্য দেশীয় বিজয় অপেক্ষা সুলতান মাহমুদের ভারতে সামরিক অভিযানগুলো অধিক আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রাক-মুসলিম ভারতীয় রাজাদের দ্বারা প্ররোচিত হলেও মাহমুদের সমরপ্রতিভা কোনো না কোনো ভাবে প্রকাশের পথ খুঁজে নিতই, হয়তো সে ক্ষেত্রে তার পক্ষে ভারতবর্ষের বদলে চীন তথা পূর্বদিকেই আক্রমণ চালনা করা সম্ভব ছিল। কিন্তু জয়পাল প্রমুখ ভারতীয় রাজন্যদের স্পর্ধা, শঠতা ও সন্ধিভঙ্গের অপরাধ তার ওই প্রতিভাকে বিশেষভাবে ভারতবর্ষের দিকেই বিকাশের অনুকূল পরিবেশ করে দিয়েছিল। পাঞ্জাবে কর্তৃত্ব বিস্তার ছাড়া ভারতীয় ভূখণ্ডে কোনো স্থায়ী রাজত্ব প্রতিষ্ঠার কোনো পরিকল্পনা তাঁর ছিল না, তিনি তা করেননি।
প্রাচীন ভারতের স্বর্ণযুগ বলে গণ্য গুপ্তযুগের সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের (৩৩০-৩৮০ খ্রিঃ) কথা ধরুন না। ঐতিহাসিক মজুমদার-রায়চৌধুরী-দত্ত তাঁকে মহান বলেছেন। তাঁর মহত্ত্বের কাহিনি যে এলাহাবাদ শিলালিপি থেকে জানা যায় একথাও ওই ঐতিহাসিকত্রয় জানিয়েছেন। কিন্তু একথা তারা জানাননি যে, ওই শিলালিপি প্রকৃতপক্ষে অশোকেরই (খ্রিঃ পূঃ ২৭৩-২৩২) সেই বিখ্যাত শিলাস্তম্ভ যেখানে অশোক দেশবাসীকে শান্তি ও অহিংসার পথে জীবনযাপনের উপদেশ দিয়েছেন এবং সেই একই স্তম্ভগাত্রে যেন অশোকের উপদেশকেই ব্যঙ্গ করে সমুদ্রগুপ্তের যুদ্ধ ও হিংসার প্রশস্তি খোদাই করা হয়েছে। সমুদ্রগুপ্ত অশ্বমেধ যজ্ঞ করেছিলেন, কিন্তু তারা এটা জানাননি যে, রাজ্য বিস্তারের জন্য অশ্বমেধ যজ্ঞ করা হত এবং তার দক্ষিণ ভারত অভিযানের কারণ ছিল নিছক রাজ্যলিপ্তা ও ধনলিপ্সা। তার সমরপ্রতিভাও বিস্ময়কর ছিল। ভিনসেন্ট স্মিথ সমর প্রতিভার জন্য সমুদ্রগুপ্তকে যে ‘ভারতের নেপোলিয়ন’ বলেছেন তার তাৎপর্য কী? সমুদ্রগুপ্তের যতরকম মুদ্রা পাওয়া গেছে সেগুলির মধ্যে মাত্র একটি বাদে বাকি সবরকম মুদ্রাতেই সমুদ্রগুপ্ত অস্ত্রধারী ও হত্যাকারীরূপে চিত্রিত। মনে হয় না কি যে, যে-জাতীয় সামরিক ‘পরাক্রমে’র জন্য সমুদ্রগুপ্ত বন্দিত সেই জাতীয় ‘পরাক্রমে’র জন্যই মাহমুদ নিন্দিত? সমুদ্রগুপ্তের অভিযানের ফলে সেখানকার সমাজ ও অর্থনীতি কি বিপর্যস্ত হয়নি? অথচ ভারত ইতিহাসে এই সমুদ্রগুপ্তের বন্দনার শেষ নেই! কেন সমুদ্রগুপ্ত ও মাহমুদের ঐতিহাসিক মূল্য নিরুপণে এমন বৈষম্য?

তাছাড়া সুলতান মাহমুদই ভারতের মানুষকে হিন্দু আর ভারতের প্রচলিত ধর্মকে হিন্দুধর্ম নাম দেন। এই অর্থে মাহমুদকেই হিন্দুধর্মের প্রতিষ্ঠাতা বলে উল্লেখ করেছেন বিশিষ্ট গবেষক সুরজিৎ দাশগুপ্ত তার ‘ভারতবর্ষ ও ইসলাম’ গ্রন্থে (কেনেথ জোন তার গ্রন্থেও৭৮ এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন) অথচ উত্তর এবং পূর্ব ভারতের বিদ্যালয়গুলিতে ইতিহাসের পুস্তকরূপে যেগুলি পড়ানো হয় সেগুলিতে সুলতান মাহমুদ রাক্ষসতুল্য একজন যুদ্ধবাজ মূর্তিধ্বংসী বর্বর মানুষরূপে চিত্রিত। ফলে বিদ্যালয়ের স্তর থেকেই অমুসলিম ছাত্রছাত্রীর মনে মাহমুদ সম্বন্ধে ও মাহমুদের ধর্ম সম্বন্ধে এক তীব্র বিদ্বেষ জাগে এবং ইসলাম ধর্মাবলম্বী ছাত্রছাত্রীদের একাংশ গ্লানিবোধে আক্রান্ত হয়, তখন তারা কোণঠাসা মানসিকতা থেকে ভাবতে শুরু করে যে, ইসলাম-বিদ্বেষীদের ঠেঙিয়ে ও লুঠ করে সুলতান মাহমুদ বেশ করেছিলেন আর অপরাংশ পরিণত হয় হীনম্মন্যে। এইভাবে বিদ্যালয়ের স্তরে ইতিহাস পড়ার সময় থেকেই অর্ধসত্য বা অসত্য তথ্যাবলীর প্রতিক্রিয়াতে শিক্ষিতশ্রেণির মধ্যে হিন্দু-মুসলিমের বিভেদ সৃষ্টি হয়। এই বিভেদের প্রভাব অনিবার্যভাবে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত বিপুল জনসমষ্টির উপরেও।
যদিও মাহমুদের ধ্বংসলীলাকে কোনো ঐতিহাসিক গোপন করতে প্রয়াসী হবেন না, তথাপি তারা তার এই কর্মযজ্ঞকে সাম্প্রদায়িক প্রতিহিংসা বলেও মনে করেন না। ধনরত্নের জন্যই তাকে এ ধরণের ভূমিকা গ্রহণ করতে হয়েছিল। ভারত অভিযানে তার বহু সাফল্য অর্জিত হলেও হিন্দুদের তিনি কখনো ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করেননি। প্রজাদের প্রতি ধর্মনির্বিশেষে তাঁর সমদৃষ্টি ছিল। আক্রমণকালে মাহমুদ হিন্দু প্রজাদের ধর্ম পালনে বাধা দিয়েছেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে এটা ঠিক তিনি ভারতের দেব মন্দিরগুলোর উপর যেভাবে আক্রমণ চালান সেটা নিঃসন্দেহে তার জীবনের একটি কলঙ্কিত দিক এবং তা কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না।
মাহমুদের জীবনের উদ্দেশ্য ছিল অফুরন্ত সম্পদের অধীশ্বর হওয়া, হয়েছিলেনও। তবে এই সম্পদ ব্যয়িত হয়েছিল শিল্প-সাহিত্যবিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতায়। অথচ ঐতিহাসিকেরা তার ধ্বংসলীলার কাহিনি বর্ণনায় প্রায় ব্যস্ত থাকেন। এর ফলে ভুলে যাওয়া হয়েছে যে, তিনি গজনীতে হিন্দু সংস্কৃতি ও সংস্কৃত সাহিত্যের বিকাশ সাধনের জন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি লাইব্রেরী ও মিউজিয়াম স্থাপন করেছিলেন।৭৯ এই গজনী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকরণে পরবর্তীকালে সেলজুক আমলে বাগদাদে স্থাপিত হয়েছিল নিজামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়।
মাহমুদ ছিলেন কালোত্তীর্ণ মহাকাব্য শাহনামা’ রচয়িতা ফিরদৌসী৮০, ঐতিহাসিক উৎবী, দার্শনিক ফারাবি, বিখ্যাত ‘তারিখ-ই-সবুক্তগীন’এর রচয়িতা বায়হাকি, চিত্রকর আবু নসর, কবি আনসারী, উজারী, আসজুদি, ফারুকি, মিনুচেহরী, আবুল হাসান, তুসী, আলি নসর, নারিন আহমদ প্রমুখ বিখ্যাত ফারসি কবি-মনীষীদের পৃষ্ঠপোষক। এঁদের নিয়ে তার দরবার ৪০০ কবি দ্বারা অলংকৃত ছিল। মাহমুদ এদেশে এনেছিলেন আলবেরুনীর মত মহাপণ্ডিত-বিজ্ঞানীকেও, যিনি সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা৮১ করে হিন্দুদের ধর্ম, সংস্কৃতি, দর্শন, বিজ্ঞান ও জীবনযাত্রার বিবরণ সমৃদ্ধ ‘ভারততত্ত্ব’ নামে অমূল্য গ্রন্থ রচনা করে গেছেন। আলবেরুনীই প্রথম ভারতীয় অঙ্কশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা ও দর্শনকে বিশ্বের দরবারে উপস্থাপিত করে ভারতকে সম্মানিত করেছিলেন। আসলে সুলতান মাহমুদের ভারত অভিযানের সামগ্রিক ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। এই অভিযানের পরবর্তী সময়ে মধ্য এশিয়া থেকে মুসলিম ফকির, সুফী, দরবেশ, পীর, সাধক প্রমুখেরা ভারতে এসে ইসলাম প্রচার করেন। ঐতিহাসিক হেগ উল্লেখ করেন, “তিনিই (মাহমুদ) প্রথম ভারতবর্ষের মধ্যস্থলে ইসলামের পতাকা উড্ডীন করেন।”

সুলতান মাহমুদের কৃতিত্ব হল, তিনি আফগান-তুর্কি-আরব-পার্শিয়ান-ভারতীয়সহ সকল সৈন্যকে একটি ঐক্যবদ্ধ চেতনায় উজ্জীবিত করতে পেরেছিলেন। প্রত্যেক সৈন্য তার কাছে সমান অনুগত ছিল। সৈন্যদের মাঝে দলগত কোনো স্বাতন্ত্র ছিল না। তাছাড়া সুলতান মাহমুদ যুদ্ধকৌশল অপেক্ষা যুদ্ধ পরিকল্পনাকে বেশী গুরুত্ব দিতেন। তিনি তার দূরদর্শিতায় বুঝেছিলেন যে, একই সঙ্গে ভারতে ও বহির্ভারতে শাসন পরিচালনা করা সম্ভব নয়। একারণেই হয়ত তিনি ভারতে স্থায়ীভাবে সাম্রাজ্য বিস্তারের চেষ্টা করেননি। ভারতে তিনি কোনও মিত্রজোট তৈরী হওয়ার সুযোগ দেননি। এজন্য তিনি কালিঞ্জর ও গোয়ালিয়রের বিরুদ্ধে পৃথক পৃথক সামরিক অভিযান প্রেরণ করেন। একই সঙ্গে আরও যে দরকার তা হল যে, সুলতান মাহমুদ জাতি-বর্ণ-ধর্ম-নির্বিশেষে সকলের আস্থা অর্জন করেছিলেন। তাঁর প্রশাসনের বিপক্ষে কোনও গণবিক্ষোভ পরিলক্ষিত হয়নি। সর্বোপরি মাহমুদের রাজ্যে আইনের শাসন বলবৎ ছিল। তিনি ধর্মনিরপেক্ষতায় দায়বদ্ধ ছিলেন। জনৈক বণিকের ঋণ যুবরাজ মাসুদ পরিশোধ না করলে উক্ত বণিক সুলতানের নিকট এজন্য বিচার প্রার্থী হন। সুলতান মাহমুদ যুবরাজ মাসুদকে দরবারে হাজির করিয়ে ঋণ পরিশোধের সুব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
মজুমদার, রায়চৌধুরি ও দত্ত তাঁদের ‘অ্যাডভান্সড় হিস্টরি অফ ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে৮২ সুলতান মাহমুদের কৃতিত্ব প্রসঙ্গে বলেছেন: “সুলতান মাহমুদ অবশ্যই বিশ্বের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামরিক অধিনায়ক। তাঁর প্রশান্ত সাহসিকতা, বিজ্ঞতা, উদ্ভাবনী শক্তি ও অন্যান্য গুণাবলী তাঁকে এশিয়ার ইতিহাসে অন্যতম প্রধান বৈচিত্রপূর্ণ ব্যক্তিত্বের মর্যাদা দিয়েছে। তার সাফল্যজনক ভারত অভিযানের উপরেও তার কৃতিত্বের ঘরে জমা পড়েছিল দুটি অবিস্মরণীয় সমর-অভিযান। যুদ্ধপ্রিয় তুর্কিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করার পথে ইলাক খান ও সেলুজাকদের সৈন্যবাহিনী তিনি ধ্বংস করেন। শ্রেষ্ঠ সমর-নায়ক সুলতান শিল্পের যোদ্ধা ও পৃষ্ঠপোষক এবং বিদ্যোৎসাহী ছিলেন।…ধর্মপ্রচারের জন্য বা রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে তিনি এদেশে আসেননি।” প্রকৃতপক্ষে মাহমুদ চেয়েছিলেন খোরাসানে তাদের বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান অব্যাহত রাখা।৮৩ আর সেই উদ্দেশ্যে তার বার বার ভারত অভিযান এবং ভারতের মন্দিরগুলি থেকে লুণ্ঠিত সম্পদ ছিল গজনীর অর্থনীতির মূলভিত্তি।৮৪
সুলতান মাহমুদের আক্রমণের ফলে পাঞ্জাবের একটি বিস্তৃত অঞ্চল গজনী সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। তার আক্রমণে রাজপুত শক্তি প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছিল এবং তিনি হিন্দুস্থানে তুর্কি সাম্রাজ্য স্থাপনের পথ প্রশস্ত করেছিলেন। পরবর্তীকালে মহম্মদ ঘোরি তুর্কি সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করার গৌরব অর্জন করেন। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন, “ The Ghaznavid occupation of the Punjab Served as they key to unlock the gates of the Indian interior. Big cracks were made in the great fabric of Indian polity, and it was no longer a question of whether but when that age old structure would fall. Neither the Arabs nor the Ghaznavid (Yemeni) Turks succeeded in adding India to the growing empire of Islam, but they paved the way for the final struggle which overwhelmed the Gangetic kingdoms some two hundread years later.”
তাছাড়া মাহমুদের ভারত অভিযানের ফলে হিন্দু ও মুসলিম সভ্যতা-কৃষ্টি প্রথম পরস্পরের সান্নিধ্যে আসে। মুসলমানরা হিন্দুদের দর্শন, বিজ্ঞান, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা প্রভৃতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে। হিন্দুরাও ইসলামের একেশ্বরবাদ ও জীবন দর্শন-বিজ্ঞান-সাহিত্য সম্পর্কে অবহিত হয়। এভাবে হিন্দু মুসলিম সংস্কৃতির সমন্বয়ের ফলে এবং উভয় সম্প্রদায়ের সান্নিধ্যে ও ভাবের আদান-প্রদানে শিল্পকলা, সাহিত্য, জীবনযাত্রা সবক্ষেত্রেই পরিবর্তন সূচিত হয়।
মাহমুদের রাজ্যে প্রত্যেকে সুখ-শান্তির ছায়ায় আরামে থাকত। সেই যুগে মাহমুদের মত এত ভাল রাজা আর কেউই ছিলেন না।৮৫ ইতিহাসে তার স্থান নির্ণয় করা খুব সহজসাধ্য নয়। সমসাময়িক মুসলমানরা তাকে গাজী ও ইসলাম নেতা বলে জানতেন। হিন্দুরা আজ পর্যন্ত তাকে নিষ্ঠুর, অত্যাচারী, আদি হুন এবং মন্দির ও মূর্তি ভঙ্গকারী বলে মনে করে থাকেন।৮৬ কিন্তু যিনি সে যুগের খবর রাখেন, তিনি অন্যমত পোযণ করতে বাধ্য। নিরপেক্ষ ঐতিহাসিকদের চোখে মাহমুদ একজন আজন্ম নেতা, ন্যায়পরায়ণ সুলতান, জ্ঞান-বিজ্ঞান-শিল্পকলার উৎসাহদাতা নন তিনি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা-বাদশাহদের একাসনে বসার সমকক্ষ।৮৭ বিশ্বখ্যাত ঐতিহাসিক গীবন তাঁকে আলেকজাণ্ডার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ সম্রাট বলেছেন।৮৮ স্যার জন মার্শাল মাহমুদকে ‘মহামতি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।৮৯ সতীশচন্দ্র বলেছেন, ‘তিনি ছিলেন মানুষের নেতা’।৯০ এহেন মাহমুদকে শুধু ‘লুণ্ঠন’ ও ‘মূর্তিভাঙা’ দিয়ে মূল্যায়ন করলে ভুল হবে। তবে এসব থেকে অবশ্যই এই সিদ্ধান্ত কেউ করবেন না যে, মাহমুদ হিন্দু প্রেমিক ছিলেন। বরং যা বলা ইতিহাস সম্মত বা উচিত তা হল, রাজনৈতিক প্রয়োজনবোধের মুখে তিনি অগ্রাহ্য করেছিলেন ধর্মীয় বিচার বিবেচনা।
শেষে বলি, সামান্য সৈনিক থেকে বিশাল সাম্রাজ্যের (মাহমুদের সাম্রাজ্য বাগদাদের খলিফার সাম্রাজ্যের চেয়েও বৃহত্তর ছিল) প্রতিষ্ঠাতা হওয়া ও ভারতে ভবিষ্যৎ মুসলিম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পথ তৈরী করা ছিল সুলতান মাহমুদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কৃতিত্ব।
লিখেছেনঃ আমিনুল ইসলাম
তথ্যসূত্রঃ
- ১. ডব্লিউ হেগ সম্পাদিত, কেমব্রিজ হিস্টরি অফ ইন্ডিয়া, খণ্ড-৩, কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস, নিউ ইয়র্ক, ১৯২৮, পৃ. ১১।
- ২. এ কে এম আলিম, ভারতে মুসলিম রাজত্বের ইতিহাস, মাওলা ব্রাদার্স, অষ্টম মুদ্রণ, ঢাকা, ২০১১, পৃ. ১৮।
- ৩. মুহম্মদ হাবিব, সুলতান মাহমুদ অব গজনী, দিল্লি, ১৯৬৭, পৃ. ৮২।
- ৪. সুলতান মাহমুদ কতবার ভারত অভিযান করেন, এ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। স্যার হেনরি ইলিয়টর্তার ‘হিস্টরি অফ ইন্ডিয়া অ্যাজ টোল্ড বাই ইটস ওন হিস্টরিয়ান’ (খণ্ড-২, পৃ. ৪৩৪-৭৮) গ্রন্থে ১৭ বার ভারত অভিযানের কথা উল্লেখ করেছেন। আরও দেখুন-লেনপুল, মিডিয়াভ্যাল ইন্ডিয়া আন্ডার মহামেডান রুল ৭১২-১৭৬৪, লন্ডন, ১৯১৬, পৃ. ১৮-১৯, পাদটিকা দ্রষ্টব্য। ইংরেজ ঐতিহাসিক ভি এন মুর-এর মতে, মাহমুদ ভারত অভিযান করেছিলেন ১২ বার। (ভি এন মুর, সোমনাথ,কলকাতা, ১৯৪৮)।
- ৫. এ কে এম আবদুল আলিম, প্রাগুক্ত, পৃ. ২০।
- ৬. এস এ এ রিজভি, দ্য ওয়ান্ডার দ্যাট ওয়াজ ইন্ডিয়া, খণ্ড-২, অনুবাদ-অংশুপতি দাশগুপ্ত, অতীতের উজ্জ্বল ভারত, প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স, পুনর্মুদ্রণ, কলকাতা, ২০১৫, পৃ. ৬৯।
- ৭. মুহম্মদ হাবিব, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩২।
- ৮. মুহম্মদ নাজিম, লাইফ অ্যান্ড টাইমস্ অফ সুলতান মাহমুদ অফ গজনী, কেমব্রিজ, ১৯৩১; পুনর্মুদ্রণ, দিল্লি, ১৯৭১, পৃ. ২০৯-২৪। ডি এন ঝা, আর্লি ইন্ডিয়া : এ কনসাইজ হিস্টরি; বাংলা অনুবাদ-গৌরীশংকর দে, আদি ভারত : একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স, কলকাতা, ২০০৮, পৃ. ১৬৬।
- ১০. এ কে মজুমদার, চালুক্যস অফ গুজরাট, বম্বে, ১৯৫৬, পৃ. ৪৩।
- ১১. ডি এন ঝা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৬।
- ১২. ঈশ্বরীপ্রসাদ, এ শর্ট হিস্টরি অফ মুসলিম রুল ইন ইন্ডিয়া, দ্য ইন্ডিয়ান প্রেস প্রাইভেট লিমিটেড, এলাহাবাদ, ১৯৬২, পৃ:৪৭।
- ১৩. ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার, হিস্টরি অফ ব্রিটিশ ইন্ডিয়া, খণ্ড-১, লন্ডন, ১৮৯৯-১৯০০,পৃ. ৯৩।
- ১৪. আলবেরুনী ভারত ইতিহাসের দিকপাল ঐতিহাসিক। তাকে উপেক্ষা করা যায় না। তিনি সোমনাথ মন্দির আক্রমণ সম্বন্ধে যে সমস্ত বক্তব্যতার ‘ভারততত্ত্ব’ গ্রন্থে পেশ করেছেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যা নয়। বার বার আক্রমণও যুদ্ধ একটা অঞ্চলে প্রভাব ফেলতেই পারে। কিন্তু আলবেরুনীর ভাষাটা লক্ষ্য করুন—মাহমুদের আক্রমণে হিন্দুরা ধূলোর মতো চারিদিকে উড়ে গেলেন। আলবেরুনী সম্পর্কে রমিলা থাপার বলেছেন, তিনি মাহমুদকে পছন্দ করতেন না। ফলে ভারতের সমস্যার জন্য মাহমুদের উপর দোষ চাপিয়ে দিতে তার দ্বিধা হয়নি। (রমিলা থাপার, সোমনাথ—দ্য মেনি ভয়েসেস অফ হিস্টরি, পেঙ্গুইন বুকস ইন্ডিয়া, নিউ দিল্লি, ২০০৮, পৃ. ২০৭-০৮)। মাহমুদের সভা-ঐতিহাসিক উতবীর সোমনাথ সংক্রান্ত বর্ণনায়ও যে বহু অবাস্তব অনৈতিহাসিক ও অবিশ্বাস্য কাহিনি স্থান পেয়েছে সে প্রসঙ্গেও রমিলা থাপার আমাদের হুশিয়ারী না দিয়ে পারেননি। (রমিলা থাপার, প্রাগুক্ত, পৃ. ২০৭-০৮)। উতবী লিখেছেন, সোমনাথ মন্দির আক্রমণে হত্যা করা হয় ১৫০০০ ও বন্দি করা হয় ৫ লক্ষ হিন্দুকে। ১৮৭১-এ প্রথম লোক গণনাতে ভারতের লোকসংখ্যা ছিল ২৫.৪ কোটি। প্রায় ৯০০ বছরেরও আগে মাহমুদের সময়ে উপমহাদেশের লোকসংখ্যা যে এর চেয়েও অনেক কম ছিল তা না মেনে উপায় নেই। তার মধ্যে একটি যুদ্ধেইমারা গেলেন ১৫০০০ আর বন্দি হয়ে গেলেন ৫ লক্ষ-এ অবিশ্বাস্য। এই পরিসংখ্যান কিসের উপর ভিত্তিকরে বলেননি উতবী। তাছাড়া উতবী কোনো অভিযানেই মাহমুদের সঙ্গী ছিলেন না। ফলে প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতা থেকে উতবী এসব লেখেননি। এগুলি কল্পকাহিনি মাত্র।
- ১৫. আর এইচ ডেভিস, লাইভস অফ ইন্ডিয়ান ইমেজেস, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস, ইউ এস এ, ১৯৯৭, পৃ. ১০০; ভারতীয় সংস্করণ, দিল্লি, ১৯৯৯।
- ১৬. গেজেটিয়ার অফ দ্য বম্বে প্রেসিডেন্সি, প্রথম খণ্ড, পৃ. ৫২৩; ইলিয়ট ও ডওসন সম্পাদিত, হিস্টরি অফ ইন্ডিয়া অ্যাজ টোল্ড বাই ইটস ওন হিস্টরিয়ান, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ. ২৪৮; আল ক্যাজবিনি, আসারুল বিলা, ইলিয়ট ও ডওসন সম্পাদিত, প্রাগুক্ত, প্রথম খণ্ড, পৃ. ১৯৭ ও ৯৭; রমিলা থাপার, সোমনাথ: একটি ইতিহাস—বহু আখ্যান; দেখুন-রমিলা থাপার, আখ্যানবলি এবং ইতিহাসের নির্মাণ, অনুবাদ-নুপুর দাশগুপ্ত, প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স, কলকাতা, ২০০৮,পৃ. ৪১। উইলসন সাহেব এমনও বলেছেন যে, সােমনাথ মন্দিরে আদৌ কোনো মূর্তি ছিল না। সুতরাং সুলতান মাহমুদ মূর্তি ভঙ্গ করবেন কিভাবে? সোমনাথ শিবলিঙ্গের নাম, সে লিঙ্গও ফাঁপা নয়, নিরেট। কাজেই এর অভ্যন্তরে কোনো ধনরত্ন থাকতে পারে না। ঐতিহাসিক স্ট্যানলি লেনপুলের অভিমতও এটাই। দেখুন-ইলিয়ট ও ডওসন, খণ্ড-২, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৭৬।
- ১৭. মাশরণশ, কমিউনাল হিস্টরি অ্যান্ড রামাস অযোধ্যা, বাংলা অনুবাদ-অরবিন্দ হালদার, ভারতের সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাস ও রামের অবোধ পত্রপুট। কলকাতা, ১৯৯৭, পৃ. ২৩।
- ১৮. রামশরণ শৰ্মা, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩।
- ১৯. ডি ডি কোশাম্বী, অ্যান ইন্ট্রোডাকসন টু দ্য স্টাডি অফ ইন্ডিয়ান হিস্টরি, বাংলা অনুবাদ- গৌতম মিত্র, ভারত-ইতিহাস চর্চার ভূমিকা, তৃতীয় মদ্রণ, কেপি বাগচী অ্যান্ড কোম্পানি, কলকাতা, ২০১৩, পৃ. ৩০৮।
- ২০. পি ভাটিয়া, দ্য পারমারস, দিল্লি, ১৯৭০,পৃ. ১৪১; হরবংশ মুখিয়া, মিডিয়াভ্যাল ইন্ডিয়ান হিস্টরি অ্যান্ড দ্য কমিউনাল অ্যাপ্রোচ : অন্তর্ভুক্ত-রমিলা থাপার হরবংশ মুখিয়া ও বিপানচন্দ্র সম্পাদিত, কমিউনালিজম অ্যান্ড দ্য রাইটিংস অফ ইন্ডিয়ান হিস্টরি, বাংলা অনুবাদ-তনিকা সরকার, সাম্প্রদায়িকতা ও ভারত ইতিহাস রচনা, কে পি বাগচী অ্যান্ড কোম্পানি, দ্বিতীয় মুদ্রণ, কলকাতা, ১৯৮৯, পৃ. ৪৭।
- ২১, রমিলা থাপার, কমিউনালিজম অ্যান্ড হিস্টরিক্যাল লিগ্যাসি : সাম ফ্যাক্টস; দেখুন-সোস্যাল সায়েন্টিস্ট, জুন-জুলাই, ১৯৯০, পৃ.১৩।
- ২২. রমিলা থাপার, কমিউনালিজম অ্যান্ড হিস্টরিক্যাল লিগ্যাসি : সাম ফ্যাক্টস, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯, নোট ২৩।
- ২৩. আর এম ইটন, টেম্পল ডি-সিক্রেশান ইন প্রি-মডার্ন ইন্ডিয়া, ফ্রন্টলাইন, ২২ ডিসেম্বর ২০০০ ও ০৫ জানুয়ারি ২০০১।
- ‘সোমনাথ, থানেশ্বর, মথুরা, কনৌজের মন্দিরের মতো সম্পদশালী মন্দিরগুলির ধ্বংসকারী গজনীর মামুদ বিপুল ধনরত্ন লুণ্ঠন করেছিলেন ঠিকই কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, নীতির পরিবর্তন ঘটেছিল। মামুদ পূর্বতন সঞ্চয় আত্মসাৎ করার স্বাভাবিক পদ্ধতিটাই অনুসরণ করেছিলেন।’ (দেখুন-ডি ডি কোশাম্বী, প্রাগুক্ত, পৃ.৩১২)।
- ২৪. ঈশ্বরীপ্রসাদ,এ শর্ট হিস্টরি অফ মুসলিম রুল ইন ইন্ডিয়া, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৩-৪৪।
- ২৫. ভি এ স্মিথ, অক্সফোর্ড হিস্টরি অফ ইন্ডিয়া, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৫৮, পৃ. ২০৮।
- ২৬. মুহম্মদ হাবিব, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭১।
- ২৭. মুহম্মদ হাবিব, প্রাগুক্ত, পৃ. ৮১।
- ঐতিহাসিক মুহম্মদ হাবিব এ প্রসঙ্গে আরও বলেন : “গজনবিদ সেনা কোনও পুণ্যবান ধর্মযোদ্ধার দল ছিল না যাদের বাঁচা-মরার প্রেরণা ছিল বিশ্বাস; এ ছিল বেতনভুক, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অভিজ্ঞদের নিয়ে গঠিত তালিকাভুক্ত সেনার বাহিনী যারা হিন্দু মুসলমান উভয়ের বিরুদ্ধেই লড়তে সমানভাবে অভ্যস্ত ছিল। দুটি মাত্র পরবর্তী অভিযানে স্বেচ্ছাসেবীরা যোগ দেয়, কিন্তু নিয়মিত সেনার তুলনায় তাদের অনুপাত ছিল নগণ্য। দ্রুত সুশৃঙ্খল গতিবিধির পক্ষে, মাহমুদ তাদের উপযুক্ত মনে করেননি। জয়গর্বে অন্ধ শক্তির সজ্জায়, সুলতান দৃষ্টিভক্তি ও মেজাজে অত্যন্ত অগণতান্ত্রিক ছিলেন। তিনি কখনই হাতে কলমে প্রয়াসী হননি। এতগুলি প্রাণ ‘স্বর্গোদ্যানে হারিয়ে’ অথবা পয়গম্বরের বাণীতে উদ্বুদ্ধ করার পক্ষে উর্বরক্ষেত্র ভারতে নষ্ট করে প্রচারক ব্রতীর যে হৃদয় হয়ত কাঁদত তা থেকে মাহমুদ বঞ্চিত ছিলেন। তার লক্ষ্য ছিল হীনতর, আরও সহজসাধ্য। ‘অবিশ্বাসী’র পার্থিব দেবমূর্তি কেড়ে নিয়ে সন্তুষ্ট মাহমুদ আর তাকে ধর্মান্তরে বাধ্য করেননি। তিনি ভারতকে যে অমুসলমান দেখেছিলেন, সেই অমুসলমাই রেখে এ দেশ থেকে বিদায় নেন।” (মুহম্মদ হাবিব, মাহমুদের চরিত্র ও কীর্তির মূল্য, অন্তর্ভুক্ত-ইরফান হাবিব সম্পাদিত, মধ্যকালীন ভারত, খণ্ড-৪, কে পি বাগচি অ্যান্ড কোম্পানি, কলকাতা, ২০০৫, পৃ.১২)।
- ২৮. মুহম্মদ হাবিব, প্রাগুক্ত, পৃ.৮১।
- ২৯. মুহম্মদ হাবিব, প্রাগুক্ত, পৃ. ৭৭,৮২।
- ৩০. মুহম্মদ নাজিম, প্রাগুক্ত, কেমব্রিজ, ১৯৩১; পুনর্মুদ্রণ, দিল্লি, ১৯৭১; দেখুন-এ কে এম আলিম, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬।
- ৩০ক. ঐতিহাসিক এলফিনস্টোন লিখেছেন : It is nowhere asserted that He ever put a Hindu to death except in battle or in the storm of a fort’; দেখুন-মুহাম্মদ ইমান-উল-হক, ভারতে মুসলিম শাসনের ইতিহাস, জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশনী, ঢাকা, পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ, তৃতীয় মুদ্রণ, ২০১৪, পৃ. ৪০। ঐতিহাসিক ঈশ্বরী টোপা ও তার পলিটিকস্ ইন প্রি-মুঘল টাইমস্ গ্রন্থে (১৯৭৬, পুনর্মুদ্রণ) এ বিষয়ে লিখেছেন : ‘The temples in fact brocken during the campaings for reasons other than religious, but in the time of peace Mahmud never demolished a single temple’.
- ৩১. মানবেন্দ্রনাথ রায়,দ্য হিস্টরিক্যাল রোল অফ ইসলাম, বাংলা অনুবাদ-অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল হাই, রেনেসাঁস, কলকাতা, ২০০৪, পৃ. ৬২।
- ৩২. ঈশ্বরী টোপা, পলিটিক্স ইন প্রি-মুঘল টাইমস, ১৯৭৬, পুনর্মুদ্রণ; দেখুন-এ কে এম আলিম, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬।
- ৩৩, আবুল কাসিম ফিরিস্তা : তারিখ-ই-ফিরিস্তা (হিস্টরি অফ দ্য মহামেডান আওয়ার ইন ইন্ডিয়া), জে ব্রিগস সম্পাদিত, কলকাতা, পুনর্মুদ্রণ, ১৯৬৫।
- ৩৪. মোল্লা আহমদ থাট্টাভি ও অন্যান্য : তারিখ-ই-আলফি, ইন্ডিয়া অফিস, পাণ্ডুলিপি ১১০-১১১।
- ৩৫. ইবনুল আসির, আল কামিল ফিত-তারিখ, থর্ণবার্গ সম্পাদিত, লিডেন।
- ৩৬. রামপ্রাণ গুপ্ত, পাঠান রাজবৃত্ত, কলকাতা, ১৯১৮, পৃ. ৪১, নোট ২।।
- ৩৭. এস এম জাফর, মিডিয়াভ্যাল ইন্ডিয়াআন্ডার মুসলিম কিংস, দ্বিতীয় খণ্ড, দ্য গজনাওয়াইডস, দিল্লি, ১৯৭২, পৃ. ১২২-২৩, ১৭৯।
- ৩৮. এসএম জাফর, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০০, ১৭৩।
- ৩৯. আবু নসর উৎবী, তারিখ-ই-ইয়ামিনী, আলি ও স্প্রেঙ্গার সম্পাদিত, আরবি পাঠ, দিল্লি, ১৮৪৭; জে রেনল্ডস অনূদিত, ইংরেজি পাঠ, লন্ডন, ১৮৫৮।
- ৪০. হাসান নিজামি:তাজ-উল-মাসির; দেখুন-ইলিয়ট ও ডওসন সম্পাদিত, খণ্ড-৩, লন্ডন, ১৮৬৭; পুনর্মুদ্রণ, নিউদিল্লি, ১৯৮১।
- ৪১. ঈশ্বরীপ্রসাদ, এ শর্ট হিস্টরি অফ মুসলিম রুল ইন ইন্ডিয়া, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৭;পাদটীকা ৫।
- ৪২. মুহম্মদ হাবিব, প্রাগুক্ত, পৃ.৫৩।
- ৪৩. সুরজিৎ দাশগুপ্ত, ভারতবর্ষ ও ইসলাম, ডি এম লাইব্রেরি, কলকাতা, ১৯৯১,পৃ. ২৮-২৯।
- ৪৪. Jawaharlal Nehru, Glimpses of World History, Jawaharlal Memorial Fund, Delhi, 1983,P-155.
- ৪৫. Jawharlal Nehru, ibid, P-157.
- ৪৬. নীরদ সি চৌধুরী, অটোবায়োগ্রাফি অফ অ্যান আননোন ইন্ডিয়ান, জয়কো পাবলিশিং হাউস, বম্বে, ১৯৭৬, পৃ. ৪২২।
- ৪৭. এস এ এ রিজভি, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬৯।
- ৪৮. আসগর আলি ইঞ্জিনিয়ার, পড়তে না দেওয়া ইতিহাস, বিপ্লবী জনমত, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সংখ্যা, ২০০২, তমলুক, পূর্ব মেদিনীপুর।
- ৪৯. বিখ্যাত ঐতিহাসিক ডি ডি কোশাম্বী আলবেরুনীর ভারত বিবরণী হতে লিখেছেন যে, কন্নড়-এর হিন্দু ভাড়াটে সৈন্যরা ভারতের বাইরে গজনির মামদের সেনাবাহিনিতে তাদের স্বধর্মী সেনাপতিদের অধীনে কাজ করেছে। (ডি ডি কোশাম্বী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩০৯-১০। আরও দেখুন-অসিতকুমার সেন, তুর্কি ও আফগান যুগে ভারত, কে পি বাগচী অ্যান্ড কোম্পানি, কলকাতা, ২য় মুদ্রণ, ২০১১, পৃ. ১৬)।
- ৫০. ইরফান হাবিব, মধ্যযুগের ভারত: একটি সভ্যতার পাঠ, দ্বিতীয় মুদ্রণ, ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট, দিল্লি, ২০১১, পৃ.৩৩, পাদটিকা।
- ৫১, এস এ এ রিজভি, প্রাগুক্ত, পৃ.৭১। আরও দেখুন-সিইবসওয়ার্থ, দ্য গজনাভিডস,এডিনবার্গ, ১৯৭৭, পৃ. ১১০
- ৫২. তারাচাদ, ইনফ্লুয়েন্স অফ ইসলাম অন ইন্ডিয়ান কালচার, বাংলা অনুবাদ-করুণাময় গোস্বামী, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৮৮, পৃ. ১১৬।
- ৫৩, ডি এন ঝা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৮।
- ৫৪. ডি এন ঝা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬৮।
- ৫৫. আসগর আলি ইঞ্জিনিয়ার, পড়তে না দেওয়া ইতিহাস, প্রাগুক্ত, ২০০২।
- ৫৬. অর্গানাইজার, ৪ জানুয়ারি ১৯৫০। দেখুন- আমিনুল ইসলাম, ভারতে মুসলিম শাসকদের মন্দির আক্রমণ: একটি পর্যালোচনা, উবুদশ, জুলাই-ডিসেম্বর, ২০০৫, কলকাতা।
- ৫৭. দ্য সেজেস অফ ইন্ডিয়া, কমপ্লিট ওয়ার্কস অফ স্বামী বিবেকানন্দ, অদ্বৈত আশ্রম প্রকাশনা, পৃ. ২৬৪।
- ৫৮ ডি, দাশগুপ্ত, বিকৃত ইতিহাস আওড়াচ্ছে সংঘ ঘাতকেরা, আজকাল, ৯ আগস্ট ২০০২, কলকাতা।
- ৫৯, ডি বি দিসলকর, ইনস্ক্রিপশনস অফ কাথিয়াবাড়, নিউ ইন্ডিয়ান অ্যান্টিকোয়ারি, ১৯৩৯, প্রথম ভাগ, পৃ. ৫৯১; দেখুন-রমিলা থাপার, সোমনাথ: একটি ইতিহাস—বহু আখ্যান, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫০।
- ৬০. A. A. Engineer, Communalism in India, Vikas Publishing House, New Delhi, 1995, P. 11.
- ৬১. TH Qureshi, The Administration of the Sultanate of Delhi, 4th edition, Karachi, 1958, P.- 11.
- ৬২. ডব্লিউ হেগ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৭।
- ৬৩, দেখুন-তেসলিম চৌধুরী, মধ্যযুগের ভারত: সুলতানী আমল, প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স, কলকাতা, ২০০৩, পৃ.৩৭।
- ৬৪. রমিলা থাপার, সোমনাথ: একটি ইতিহাস—বহু আখ্যান, প্রাগুক্ত, পৃ.৩৫-৬১।
- ৬৫. Romila Thapar, The Somnath-The manyVoices ofa History, Penguin Books India, New Delhi, 2008. আরও দেখুন-এম এ ঢাকি ও এইচ পিশাস্ত্রী, দ্য রিডল অফ দ্য টেম্পল অফ সোমনাথ, বারাণসী, ১৯৭৪।
- ৬৬. রমিলা থাপার, সোমনাথ : একটি ইতিহাস—বহু আখ্যান, প্রাগুক্ত, পৃ.৩৬।
- ৬৭. কে এম মুনশি, সোমনাথ :দ্য শ্রাইন ইটারনাল, বম্বে, ১৯৫১, পৃ. ১০৫-৩৩।
- ৬৮. ভি কে জৈন, ট্রেড অ্যান্ড ট্রেডার্স ইন ওয়েস্টার্ন ইন্ডিয়া, দিল্লি, ১৯৯০; দেখুন-রমিলা থাপার, সোমনাথ : একটি ইতিহাস—বহু আখ্যান, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৬।
- ৬৯. রমিলা থাপার, সোমনাথ : একটি ইতিহাস—বহু আখ্যান, প্রাগুক্ত, পৃ.৩৭।
- ৭০. জে ক্লাট, এক্সট্র্যাক্টস ফ্রম দ্য হিস্টরিক্যাল রেকর্ডস অফ দ্য জৈনস, ইন্ডিয়ান অ্যান্টিকোয়ার, ১৮৮২, একাদশ ভাগ, পৃ. ২৪৫-৪৬।
- ৭১. রমিলা থাপার, সোমনাথ : একটি ইতিহাস-বহু আখ্যান, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৪।
- ৭২. রমিলা থাপার, সোমনাথ : একটি ইতিহাস—বহু আখ্যান, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৪।
- ৭৩. Romila Thapar, The Somnath— The many Voices of a History, ibid, P. -6.
- ৭৪. রমিলা থাপার, সোমনাথ : একটি ইতিহাসবহুআখ্যান, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৯।
- ৭৫, কে এম মুনশি, প্রাগুক্ত, পৃ.৮৯।
- ৭৬. Romila Thapar, The Somnath—The many Voices of a History, Verso, London, 2005, P.-xii.
- ৭৭. J Fergusson, A History of Indian and Eastern Architechture, Vol.-1, 2nd edition, Burgess and R. P. Spiers, London, 1910, P-496.
- ৭৮. কেনেথ জোন্স, আর্যধর্ম : হিন্দু কনসাসনেসইন নাইন্টিস্থ সেঞ্চুরি পাঞ্জাব, মনোহর বুক সার্ভিস, নয়া দিল্লি, ১৯৭৬।
- ৭৯. আবদুল করিম, ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসন, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, দ্বিতীয় মুদ্রণ, ঢাকা, ২০১৫, পৃ. ২১।
- ঐতিহাসিক ভি ডি মহাজনও বলতে বাধ্য হয়েছেন যে, “সুলতান মাহমুদ শিল্পী এবং স্থপতিদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। অনেক মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাহ গজনীতে নির্মিত হয়েছিল। এখানে একটি বড় মসজিদ ছিল যার চারপাশে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক থাকার ব্যবস্থা ছিল। গজনী মধ্য এশিয়ার শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর নগরীতে পরিণত হয়েছিল।”
- ৮০, মহাকবি ফিরদৌসী খোরাসানের তুস নগরে ৯৫০ সালে জন্মগ্রহণ করেন ও ১০২০ সালে প্রয়াত হন। তাঁর ‘শাহনামা’ তাঁকে অমর করে রেখেছে। ‘শাহনামা’তে সুলতান মাহমুদ সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তা প্রখ্যাত পণ্ডিত ব্রাউন এরূপে অনুবাদ করেছেন
- “Long years this Shahanama I Toiled to complete,
- That the king might award me some recompen se meet,
- But naught save a heart writing with grief and despair,
- Did I get from those promises empty as if!
- In silver and gold had I stood to knee!
- But being by birth not a prince but a poor,
- To praise of the noble he could not endure !”
- ৮১. আবদুল করিম, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩।
- ঐতিহাসিক এস এ এ রিজভি আলবেরুনী সম্বন্ধে বলেছেন, একথা আমরা বলতে পারি যে অন্তত অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত জগতের কোথাও অভারতীয় এমন কেউ ছিলেন না যিনি হিন্দুদের ধর্ম ও রীতিনীতি মধ্য এশিয়ার এই বিদ্বান মানুষটির চেয়ে বেশি বুঝতেন। ওই যুগের কথা বিবেচনা করলে এ কথা মানতেই হবে যে তার জ্ঞানের পরিধি ছিল সর্বব্যাপী। সহিষ্ণুতা, উদারতা ও সহজ বুদ্ধি ছিল তাঁর চিন্তাধারার বৈশিষ্ট্য। (এস এ এ রিজভি, প্রাগুক্ত, প, ৪২৬-২৭)।
- ৮২. RC Majumder-K K Dutta-HC Ray Chaudhury, An Advanced History of India, Macmillian, London, 1960.
- ৮৩, সিইবসওয়ার্থ, দ্য লেটার গজনাভিডস, প্লেনডার অ্যান্ড ডিকে : দ্য ডায়ন্যাস্টিইন আফগানিস্তান অ্যান্ড নর্দার্ন ইন্ডিয়া ১০৪০-১১৮৬, নিউ দিল্লি, ১৯৯২। পৃ.৩২-৬৮।
- ৮৪. সতীশচন্দ্র, মিডিয়াভ্যাল ইন্ডিয়া, অনুবাদ-মুজিবর রহমান ও সাবির আলি, মধ্যযুগের ভারত, খণ্ড-১ (১২০৬-১৫২৬), বুক পােষ্ট পাবলিকেশন, কলকাতা, ২০১৩, পৃ ১৬।
- ৮৫. Elphinstone, the History of India, London, 1916, P.- 334; দেখুন-গোলাম আহমদ মোর্তজা, চেপে রাখা ইতিহাস, বিশ্ববঙ্গীয় প্রকাশন, দশম সংস্করণ, কলকাতা, ২০০৬, পৃ. ৮১।
- ৮৬. ঈশ্বরীপ্রসাদ, এ শর্ট হিস্টরি অফ দ্য মিডিয়াভ্যাল ইন্ডিয়া, এলাহাবাদ, ১৯৩৩, পৃ ১১৫।
- ৮৮. এডওয়ার্ড গীবন লিখেছেন, “The Sultan of Gazana surpassed the limits of the conquest of Alexander.’ দেখুন- এডওয়ার্ড গীবন, ডেকলাইন অ্যান্ড ফল অফ দ্য রোমান এম্পায়ার, খণ্ড-৬, পৃ. ২৪১।
- ৮৯. কমব্রিজ হিস্টরি অফ ইন্ডিয়া, খণ্ড-৩, কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯২৮, পৃ. ৫৭৪।
- ৯০. শচন্দ্র মিডিয়াভ্যাল ইন্ডিয়া, অনুবাদ-মুজিবর রহমান ও সাবির আলি, মধ্যযুগের ভারত, খণ্ড-১ (১২০৬-১৫২৬), প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬।
কোন মন্তব্য নেই