Page Nav

HIDE

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Grid

GRID_STYLE

শিরোনাম

latest

মাতৃভাষার গুরুত্ব ও তাৎপর্য

মাতৃভাষা আল্লাহর এক অপার নেয়ামত মাতৃভাষার মর্যাদা ইসলামে স্বীকৃত। মহানবীর (সা.) মাতৃভাষা ছিল আরবি। বায়হাকি শরিফের একটি হাদিসে তাঁর আরবিপ্রীত...

মাতৃভাষা আল্লাহর এক অপার নেয়ামত

মাতৃভাষার মর্যাদা ইসলামে স্বীকৃত। মহানবীর (সা.) মাতৃভাষা ছিল আরবি। বায়হাকি শরিফের একটি হাদিসে তাঁর আরবিপ্রীতির বিরল নজির পাওয়া যায়। তিনি বলেন- ‘তোমরা তিন কারণে আরবদের ভালোবাস। প্রথমত, আমি আরবীয়; দ্বিতীয়ত, পবিত্র কোরআনের ভাষা আরবি এবং তৃতীয়ত, জান্নাতবাসীদের ভাষাও হবে আরবি। রাসুলের (সা.) উল্লিখিত বাণীর পরিপ্রেক্ষিতে মাতৃভাষার প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। একইভাবে এর মাধ্যমে অপরাপর ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর স্ব-স্ব ভাষার গুরুত্বও বৃদ্ধি পেয়েছে। মাতৃভাষার গুরুত্ব আমাদের কাছে আরও বেড়ে যায়, যখন দেখি মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- وماأرسلنا من رسول الا بلسان قومه ليبين لهم অর্থাৎ ‘আমি প্রত্যেক রাসুলকে তাঁর জাতির মাতৃভাষাতেই প্রেরণ করেছি, যাতে তিনি আল্লাহপাকের বাণী সহজেই তাদের কাছে ব্যাখ্যা করতে পারেন (সুরা ইব্রাহীম, আয়াত :৪)।’ মহান আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় রাসুলের (সা.) বাণীর মাধ্যমে মাতৃভাষার গুরুত্ব, তাৎপর্য ও মর্যাদা সম্পর্কে সম্যক অবহিত হওয়া যায়।

পৃথিবীর সব জনপদে তাদের নিজ নিজ ভাষা রয়েছে, যা তাদের মায়ের ভাষা, মুখের ভাষা, স্বপ্নের ভাষা এবং প্রাত্যহিক মনের অব্যক্ত বিষয়াবলি প্রকাশ তথা জীবন-যাপনের প্রিয় ভাষা। মমতাময়ী মায়ের কাছ থেকে প্রথম সে ভাষা শেখে বিধায় তার নামকরণ করা হয়েছে মাতৃভাষা হিসেবে। বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত ছয় সহসস্রাধিক ভাষার মধ্যে একেক জনপদের লোকেরা তাদের সেই প্রিয় মাতৃভাষায় কথা বলে থাকে। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনের সূরা- রুমের ২১ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন, ومن أيته خلق السموات والأرض واختلاف السنتكم و الوانكم অর্থাৎ আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র। এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে।’পৃথিবীর অপরাপর জিনিসের মতো মাতৃভাষার স্রষ্টাও স্বয়ং মহামহিম আল্লাহ। তিনি সুরা আর রাহমানের ৩-৪নং আয়াতে বলেন- خلق النسان، علمه البيان অর্থাৎ ‘তিনিই মানব সম্প্রদায় সৃষ্টি করেছেন এবং তাদেরকে মনের ভাব-বর্ণনা (ভাষা) প্রকাশ করতে শিখিয়েছে।

কোরআন মজিদে রয়েছে- ‘হে মানব সম্প্রদায়, আমি তোমাদের এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হও (সুরা হুজুরাত আয়াত: ১৩)‘ পৃথিবীর নানা জাতির বসবাস এবং তাদের মনোভাব প্রকাশের জন্য মাতৃভাষাও রয়েছে। সেই মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার রক্ষার সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হয়েছে তুরস্ক, বুলগেরিয়া, মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল আর ভারতের উত্তরপ্রদেশসহ বিশ্বের কিছু জাতিগোষ্ঠীর। কিন্তু‘ বাঙ্গালি জাতি কেবল আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় বাংলার মানুষকে জীবনও দিতে হয়েছে। ১৩৫৯ বঙ্গাব্দের ৮ ফালগুন মোতাবেক ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী বাঙ্গালীর ইতিহাসে রচিত হয়েছে অমর এক শোকগাথা, যেখানে শাহাদতের সুধা পান করতে হয়েছে বরকত, সালাম, রফিক, জব্বারসহ অনেককেই। বাংলার দামাল ছেলেরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে মায়ের ভাষাকে মুক্ত করেছে, যা ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্যকে আরও গভীরে নিয়ে গেছে। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই আমাদের উচিত বিশুদ্ধ মাতৃভাষা চর্চা করা। বাংলাকে সব বিকৃতি থেকে রক্ষা করতে হবে।

মহান ভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক ধারণা থেকে আমরা বলতে পারি, ১৯৫২ সালের বাংলা ভাষার এই আন্দোলনের প্রধানত উদ্দেশ্য ছিল মাতৃভাষা বাংলার অবাধ ব্যবহার ও তার সার্বিক উৎকর্ষ বিধান এবং সর্বস্তরে চর্চার অধিকার আদায় করা।
অপর উদ্দেশ্যটি ছিল মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালতসহ রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠানে এর যথার্থ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং জাতীয় স্বাতন্ত্রীয়-স্বকীয়তা বজায় রাখা ও সারাবিশ্বে এ ভাষার পরিচিতি আরও উন্নত পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া। সে জন্যই আমাদের ভাষা আন্দোলনের মূল স্লোগান ছিল- ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’।
ভাষা আন্দোলনের আরেকটি মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল জাতি হিসেবে বাঙালির সব গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার। কেননা, সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙ্গালির মুখের ভাষার পরিবর্তে সংখ্যালঘিষ্ঠ কোনো জাতির ভাষা এখানে চাপিয়ে দেওয়া কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না; বরং তা সভ্যতা ও মূল্যবোধের চরম পরিপন্থি’। এ রকম একটি অগণতান্ত্রিক, অন্যায় ও মানবাধিকার পরিপন্থি’ বিষয়ের তীব্র প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করতে গিয়েই মহান ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল; যা পরবর্তী সময়ে বাঙালি জাতির জন্য অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সব বৈষম্য দূরীকরণে পর্যায়ক্রমে এক ঐতিহাসিক স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে রূপ পরিগ্রহ করেছিল। এ ক্ষেত্রে অমর একুশের অকুতোভয় বীর শহীদদের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে মাতৃভাষার প্রতি ভালবাসা ও তার সম্মান রক্ষাকরার তাওফিক দান করুন। আমিন।

মাওলানা হাফেজ মুহিউদ্দিন লেকখ, শিক্ষক: এহয়াউল উলুম আরবিয়া মাদ্রাসা,দক্ষিন হালিশহর, চট্টগ্রাম।

কোন মন্তব্য নেই